বেরলিনের বার্লিনেল চলচ্চিত্র উৎসবে এই বছর পুরস্কার বিতরণীর সময় কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা গাজা অঞ্চলে ইসরায়েলি হামলার ফলে ঘটমান মানবিক সংকটকে ‘গণহত্যা’ বলে সমালোচনা করেন। এই মন্তব্যগুলো জার্মান ও ইসরায়েলি সরকারের নীতির ওপর তীব্র প্রশ্ন তুলতে পারে, ফলে জার্মানির রাজনৈতিক পরিবেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সিরিয়ান-ফিলিস্তিনি পরিচালক আবদাল্লাহ আল-খাতিব তার ‘ক্রনিকলস অফ এ সিজ’ চলচ্চিত্রের জন্য বার্লিনেল পার্সপেকটিভস সেকশনের পুরস্কার গ্রহণের সময় মঞ্চে উঠে বলেন, বর্তমান জার্মান সরকার ইসরায়েলের গাজা হামলায় সহায়তা করছে। তিনি জার্মানিকে ‘গণহত্যার অংশীদার’ বলে অভিহিত করেন এবং ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন আসবে বলে ইঙ্গিত দেন, যেখানে গাজা ও ফিলিস্তিনের জন্য দাঁড়ানো ও না দাঁড়ানো উভয় পক্ষই স্মরণীয় হবে।
আল-খাতিবের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ‘ক্রনিকলস অফ এ সিজ’ চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এই ধারাবাহিক নাটকটি ধ্বংসপ্রাপ্ত কোনো শহরের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে বসবাসরত ফিলিস্তিনি জনগণের দৈনন্দিন সংগ্রামকে চিত্রিত করে, যদিও শহরের নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে দৃশ্যাবলি গাজার সঙ্গে স্পষ্ট সাদৃশ্য রাখে।
লেবাননের পরিচালক মারি-রোজ ওস্টা, তার ‘সোমডে এ চাইল্ড’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য সোনার ভালুক পুরস্কার জেতার পর মঞ্চে গিয়ে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণকে নিন্দা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গাজা, পুরো ফিলিস্তিন এবং লেবাননের শিশুরা কোনো অতিমানবীয় ক্ষমতা ছাড়াই ইসরায়েলি বোমার শিকার হচ্ছে।
ওস্টা আরও বলেন, কোনো শিশুকে বেঁচে থাকতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দরকার নেই; বরং আন্তর্জাতিক আইনের পতন এবং ভেটো ক্ষমতার দ্বারা সমর্থিত গণহত্যা তাদেরকে বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছে। তিনি আন্তর্জাতিক আইনের ভাঙ্গনকে ‘ধস’ বলে বর্ণনা করেন এবং এই পরিস্থিতি সমাধানের জন্য তৎপরতা দাবি করেন।
এই রাজনৈতিক বক্তব্যের পর জার্মানির পরিবেশ মন্ত্রী কারস্টেন শ্নাইডার মঞ্চ ত্যাগ করেন। শ্নাইডারকে দেখা যায় না, এবং তার অফিসের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয় যেখানে বলা হয়েছে, মন্ত্রী এই ধরনের মন্তব্যকে অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে গেছেন।
মন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে জার্মানির রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও মিডিয়া তীব্রভাবে বিশ্লেষণ করে, কিছু বিশ্লেষক এটিকে সরকারের নীতি ও মানবাধিকার বিষয়ক অবস্থানের স্পষ্ট প্রকাশ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, কিছু গোষ্ঠী মন্ত্রীর পদত্যাগকে স্বাধীন মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা হিসেবে সমালোচনা করে।
বার্লিনেল পুরস্কার অনুষ্ঠানটি চলচ্চিত্র শিল্পের সাফল্য উদযাপন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিতর্কের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। যদিও কিছু অংশে উত্তেজনা দেখা যায়, তবে পুরস্কার বিতরণী শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয় এবং বিজয়ী চলচ্চিত্রগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
এই ঘটনায় দেখা যায়, শিল্প ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের ব্যক্তিত্বরা আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশে দ্বিধা করে না, এবং তা কখনও কখনও রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের রূপ নেয়।
বার্লিনের এই পুরস্কার অনুষ্ঠানটি গাজা সংকটের প্রতি আন্তর্জাতিক মনোযোগ বাড়িয়ে তুলেছে, এবং জার্মানির অভ্যন্তরে মানবাধিকার ও যুদ্ধবিরোধী নীতির ওপর নতুন আলোচনার সূচনা করেছে।
শেষে, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের এই ধরনের প্রকাশনা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নীতিতে কী প্রভাব ফেলবে তা এখনও অনিশ্চিত, তবে বার্লিনের মঞ্চে তাদের কণ্ঠস্বর স্পষ্টভাবে শোনা যায় এবং তা গ্লোবাল আলোচনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



