মেক্সিকোর সর্বাধিক অনুসন্ধানাধীন মাদকদ্রব্য অপরাধী নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্টেস, যাকে ‘এল মেনচো’ নামে বেশি চেনা যায়, সম্প্রতি নিহত হয়েছে। মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ এই অপরাধীর মৃত্যু ঘটেছে, যা দুই দেশের জন্য একটি কৌশলগত সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এল মেনচো মিচোয়াকানের এক গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার শৈশবের বেশিরভাগ সময় কৃষিকাজে কাটিয়েছেন। সীমিত সম্পদ ও শিক্ষার পরেও তিনি অপরাধ জগতে প্রবেশ করে দ্রুতই স্থানীয় গ্যাংগুলোর মধ্যে স্বীকৃতি পেতে শুরু করেন। তার আক্রমণাত্মক স্বভাব ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে দ্রুতই বৃহত্তর গোষ্ঠীর নেতৃত্বে পৌঁছে দেয়।
১৯৯০-এর শেষের দিকে তিনি জালিস্কো-নিউ জেনারেশন কার্টেল (CJNG) গঠনের মূল চালিকাশক্তি হন এবং কয়েক বছরেই এই সংগঠনকে মেক্সিকোর সবচেয়ে হিংস্র ও শক্তিশালী মাদক গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার নেতৃত্বে CJNG গুলির আক্রমণ, ধ্বংস এবং লুটপাটের পরিসর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মেক্সিকোর নিরাপত্তা সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা উভয়ই এই অপারেশনে অংশগ্রহণের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় মেক্সিকোর সশস্ত্র বাহিনীর দলটি এল মেনচোর অবস্থান সনাক্ত করে এবং তাকে লক্ষ্যবস্তু করে। এই পারস্পরিক সহযোগিতা দুই দেশের সীমান্ত পারাপার অপরাধের মোকাবিলায় নতুন এক মডেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেক্সিকোর সামরিক বাহিনী এখন এই গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীকে অপসারণের মাধ্যমে CJNG-কে দুর্বল করার সুযোগ পেয়েছে। যদিও একক নেতার মৃত্যু গোষ্ঠীর কাঠামোকে তাত্ক্ষণিকভাবে ভেঙে দিতে পারে না, তবু এটি অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে অস্থায়ী ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
এল মেনচোর মৃত্যুর পর গোষ্ঠীর সদস্যরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। গার্ডেন, গেরেরো, তামাউলিপাস সহ আটটি রাজ্যে রোডব্লক স্থাপন করা হয়েছে এবং সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা বাড়ছে। মেক্সিকো সিটি ও পার্শ্ববর্তী মেক্সিকো স্টেটেও সশস্ত্র গ্যাংয়ের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা শহুরে নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে।
বিশেষ করে জালিস্কোতে সহিংসতা তীব্রতর হয়েছে। গুয়াদালাহারায় মাস্কধারী গুলিবিদ্ধরা দোকানগুলোকে অগ্নিকাণ্ডে জ্বালিয়ে দেয়, যা এই গ্রীষ্মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে বাধা সৃষ্টি করে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং নিরাপত্তা গার্ডের উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
পুয়ের্তো ভাল্লার্তায় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা হঠাৎ বাড়ি থেকে বের হওয়া থেকে বিরত থেকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন। সমুদ্রতীরের এই জনপ্রিয় রিসোর্টে হঠাৎ ঘটিত গুলিবিদ্ধ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে পর্যটন কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে, এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি শিথিল না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতা অব্যাহত রাখবে।
গোষ্ঠীর নিম্নস্তরের সদস্যদের মধ্যে এই ধরণের প্রদর্শনীকে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের রূপে দেখা হচ্ছে। তবে রোডব্লক ও জ্বালানী গাড়ি কেবলই শো না, বরং ভবিষ্যতে সংঘাতের মাত্রা বাড়তে পারে কিনা তা এখনও অনিশ্চিত। নিরাপত্তা বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ ও কৌশলই নির্ধারণ করবে এই উত্তেজনা কমবে নাকি বাড়বে।
অধিক তদন্তের জন্য মেক্সিকোর ফেডারেল পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী এখন এল মেনচোর মৃত্যুর পরবর্তী ধাপগুলো বিশ্লেষণ করছে। গ্যাংয়ের উচ্চপদস্থ সদস্যদের গ্রেফতার, অবৈধ অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যের ধ্বংস, এবং গ্যাংয়ের আর্থিক নেটওয়ার্কের বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এছাড়া, মৃত অপরাধীর সম্পত্তি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের উপর আইনি প্রক্রিয়া চালু করা হবে, যা ভবিষ্যতে আদালতে উপস্থাপিত হবে।
সামগ্রিকভাবে, এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর অপরাধ নীতি ও নিরাপত্তা কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। যদিও গ্যাংয়ের কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যাওয়া এখনো দূরের কথা, তবু সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধী গোষ্ঠীর ক্ষমতা সীমিত করা সম্ভব হতে পারে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা নির্ভর করবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকরী পদক্ষেপ ও জনসাধারণের সহযোগিতার ওপর।



