জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি মাসে রাজস্ব সংগ্রহের বৃদ্ধির হার মাত্র ৩.২১ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় সর্বনিম্ন। এই পতনটি দেশের নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে ঘটেছে এবং অর্থবছরের মোট বৃদ্ধির প্রবণতাকে প্রভাবিত করেছে।
এনবিআরের হালনাগাদ ডেটা দেখায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব সংগ্রহে দ্বি-অঙ্কের বৃদ্ধিই দেখা গিয়েছে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরুর দিকে কোটা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক গতি ধীর হয়ে গিয়েছিল, যা রাজস্ব আদায়ে তীব্র হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথমার্ধে, জুলাই মাসে রাজস্ব বৃদ্ধি ২৪.৬১ শতাংশে শীর্ষে পৌঁছায়, এরপর আগস্টে ১৮.০৩ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরের শেষে ২০.১৫ শতাংশ বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়। এই তিন মাসের সংমিশ্রণে, পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় প্রথমার্ধে মোট রাজস্ব ২০.৮০ শতাংশ বাড়ে।
অক্টোবর মাসে বৃদ্ধির হার হঠাৎ ৩.৩১ শতাংশে নেমে আসে, যা পূর্বের ধারার বিপরীত দিক নির্দেশ করে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে যথাক্রমে ১৫.৪১ এবং ১১.৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি হলেও, জানুয়ারি মাসে আবার ৩.২১ শতাংশে নেমে গিয়ে বছরের প্রথম সাত মাসের গড় বৃদ্ধি ১২.৯০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে।
ভোটের আগে শেষ সাত মাসে রাজস্ব সংগ্রহের মোট পরিমাণ ২,২৩,৬৩৮ কোটি টাকা, যেখানে একই সময়ে পূর্ববর্তী অর্থবছরে ১,৯৮,০৯০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। লক্ষ্য থেকে প্রায় ৬০,১১২ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা যায়, যা বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য।
অর্থবছরের শেষ দিকে সাধারণত রাজস্ব বৃদ্ধি প্রত্যাশিত হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি দেখায় যে সরকারকে লক্ষ্য পূরণের জন্য সংগ্রহের গতি ত্বরান্বিত করতে হবে। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এনবিআর ৫,০৩,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে, যা মূল বাজেটের ৪,৯৯,০০০ কোটি টাকার চেয়ে সামান্য বেশি। তবে বাজেটের সামগ্রিক লক্ষ্য ৫,৬৪,০০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৯ শতাংশের সমান, এবং এর মধ্যে অন্যান্য উৎস থেকে ৬৫,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব সংগ্রহে এই ঘাটতি ব্যবসা ও বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। সরকারী তহবিলের ঘাটতি বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ গ্রহণ বাড়াতে পারে, যা সুদের হার ও মুদ্রাস্ফীতি চাপে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, পাবলিক সেক্টরের প্রকল্পে তহবিলের ঘাটতি অবকাঠামো বিনিয়োগের গতি ধীর করতে পারে, যা নির্মাণ ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের আয় হ্রাসের দিকে নিয়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি রাজস্ব সংগ্রহের গতি পুনরায় ত্বরান্বিত না হয়, তবে পরবর্তী ত্রৈমাসিকে আর্থিক ঘাটতি বাড়তে পারে এবং সরকারকে অতিরিক্ত কর আরোপ বা ব্যয় সংকোচনের পথে যেতে হতে পারে। তবে, যদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং কোটা আন্দোলনের পরবর্তী প্রভাব কমে যায়, তবে রাজস্ব সংগ্রহের পুনরুদ্ধার সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জানুয়ারি মাসের ৩.২১ শতাংশের নিম্ন বৃদ্ধির হার দেশের আর্থিক পরিকল্পনার জন্য সতর্ক সংকেত। লক্ষ্য পূরণের জন্য রাজস্ব সংগ্রহের গতি বাড়ানো এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি, নতুবা বাজেট ঘাটতি ও ঋণবৃদ্ধি ব্যবসা ও বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে।



