রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউ (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০২১ সালে ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকার দরপত্র প্রকাশ করা হয়। দরপত্রে লিফটের মান ‘এ’ গ্রেড নির্ধারিত থাকলেও, রামেকের জন্য কাজ করা ‘ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন’ নামের স্থানীয় ঠিকাদার ‘সি’ গ্রেডের লিফট সরবরাহ করে। লিফটের উৎপত্তি জাপানি হওয়ার দাবি থাকা সত্ত্বেও, প্রকৃতপক্ষে তা চীনের তৈরি হয়।
লিফটের সরবরাহের পর, ঠিকাদার জাপানি প্রতিষ্ঠানের নামে একটি নকল ই‑মেইল তৈরি করে চিঠিপত্রের মাধ্যমে লিফটের উৎসকে জাপানি হিসেবে উপস্থাপন করে। এই কৃত্রিম পদ্ধতি প্রকাশের পর, রামেকের প্রশাসন অভিযোগ উত্থাপন করে এবং গণপূর্ত বিভাগের ওপর তদন্তের দাবি জানায়। ২০২৪ সালের ৬ মে গৃহীত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায়, দরপত্রের শর্তাবলী অনুসরণ না করে সস্তা মানের লিফট সরবরাহ করা হয়েছে।
প্রাথমিক লিফটটি ২০২৪ সালে আইসিইউ ভবনে স্থাপন করা হয়, তবে মানের পার্থক্য ও জালিয়াতি প্রকাশের পর ঠিকাদার লিফটটি সরিয়ে নেয়। এরপর ঠিকাদার নতুন লিফট বসানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, যা দরপত্রে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় রামেকের প্রশাসন গণপূর্ত বিভাগের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে লিখিত নোটিশ পাঠায়। শেষ পর্যন্ত, নতুন লিফটটি গত বছরের ১ অক্টোবর রামেকের ব্যবহারিক হয়ে ওঠে।
নতুন লিফটের আমদানিকর্তা হিসেবে ‘সেল করপোরেশন বিডি’ নামের একটি বাংলাদেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়। লিফটের দ্বিতীয় ব্যাচের আগমনের পর, বন্দরে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন না করা সত্ত্বেও, রামেকের প্রশাসন সন্দেহ প্রকাশ করে এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) দুইজন অধ্যাপককে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর গঠিত হয় এবং পরবর্তী মাসগুলোতে লিফট সংক্রান্ত নথিপত্রের তিনটি পর্যায়ে পর্যালোচনা করে। প্রথম পর্যায়ে ১৪ অক্টোবর, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪ নভেম্বর এবং তৃতীয় পর্যায়ে ১১ নভেম্বর নথি পরীক্ষা করা হয়।
তদন্তের ফলাফল রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি.কে.এম. মাসুদ উল ইসলামকে জানানো হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে লিফটের সরবরাহ ও স্থাপন প্রক্রিয়ার সব ধাপের বিশদ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিফট সরিয়ে নেওয়ার পর রামেকের তৎকালীন পরিচালক এবং রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগ-২-এর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিউল আজমের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী রামেককে আশ্বাস দেন যে, লিফটের আমদানি ও স্থাপন সংক্রান্ত সকল বিষয় নির্ধারিত প্রতিনিধির মাধ্যমে সমাধান হবে।
তবে তদন্তে প্রকাশ পায় যে, লিফটের প্রকৃত উৎপত্তি ও মান সম্পর্কে তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং জাপানি লিফটের দাবি ভিত্তিহীন ছিল। এই জালিয়াতি প্রকাশের পর, গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তার ওপর ঠিকাদারকে সমর্থন করার অভিযোগ ওঠে, যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
গণপূর্ত বিভাগ-২ এবং রামেকের মধ্যে চলমান আলোচনার ফলস্বরূপ, লিফটের সঠিক মান নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ধরনের জালিয়াতি রোধের জন্য কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বয়ে, লিফটের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত পরিদর্শন ও মান যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা হবে।
এই ঘটনা রামেকের আইসিইউ প্রকল্পের সুষ্ঠু বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং সরকারি দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



