মেক্সিকোর জালিস্কো রাজ্যের এক সামরিক অভিযানতে জেলিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল (CJNG) এর নেতা নেমেসিও রুবেন ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, যাকে এল মেনচো নামে চেনা যায়, নিহত হয়। তার মৃত্যুর কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কার্টেল তার সমর্থকদের আদেশে বহু রাজ্যে সমন্বিত হামলা চালায়, যা দেশব্যাপী নিরাপত্তা সংকটের দিকে নিয়ে যায়।
মেক্সিকোর নিরাপত্তা সংস্থা রেইডারদের রিপোর্ট অনুযায়ী, এল মেনচোর মরণোত্তর গুলিবর্ষণ ও বিস্ফোরণ ঘটেছে গুয়াদালাহারা, নায়ারিট, এবং ট্লাক্সকালান সহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে। গুলিবর্ষণকারী দলগুলো সশস্ত্র গাড়ি, ড্রোন এবং উচ্চমানের অস্ত্র ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় আক্রমণ চালায়, ফলে নাগরিক ও নিরাপত্তা কর্মীর মৃত্যু ও আঘাতের সংখ্যা বাড়ে।
CJNG কে সাধারণ গ্যাং হিসেবে নয়, বরং আধুনিক সামরিক ক্ষমতা সম্পন্ন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মতো বিবেচনা করা হয়। এল মেনচোর নেতৃত্বে সংগঠনটি ট্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং সীমান্ত পারাপার অস্ত্র সরবরাহে বিশেষায়িত হয়ে উঠেছে। এই কাঠামো তাকে মেক্সিকোর বহু রাজ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এবং প্রতিপক্ষকে ভয় দেখাতে সক্ষম করেছে।
মেক্সিকোর সীমা পারাপার অপরাধে CJNG এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মাদক বাজারে সরাসরি ছড়িয়ে পড়েছে। সংগঠনটি ফেন্টানিলসহ সিন্থেটিক মাদকের বড় পরিমাণে সরবরাহ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছে এবং রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, CJNG এর নেটওয়ার্ক ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। এই আন্তর্জাতিক সংযোগগুলো মাদক উৎপাদনকারী দেশ, পরিবহনকারী গোষ্ঠী এবং শেষ ব্যবহারকারীর মধ্যে সেতু গড়ে তুলেছে, ফলে একটি বৈশ্বিক অপরাধ ইকোসিস্টেমের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এল মেনচোর জন্ম ১৭ জুলাই ১৯৬৬ সালে মিচোয়াকানের আগুইলিলায়। তিনি অপরাধের প্রান্তিক থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে মাদক ব্যবসার জগতে প্রবেশ করেন। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে তিনি মেক্সিকোর অপরাধ জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উদয় হন এবং দ্রুতই নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নেন।
প্রাথমিকভাবে তিনি স্থানীয় মাদক চোরাচালান ও চোরাচালান গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বৃহত্তর গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিজের স্বতন্ত্র সংগঠন গড়ে তোলেন। ২০১০-এর দশকে তিনি জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল প্রতিষ্ঠা করেন, যা তার মৃত্যুর আগে মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধ সংগঠনের একটি হয়ে ওঠে।
এল মেনচোর নেতৃত্বে CJNG দ্রুতই আধুনিক অস্ত্র, ড্রোন এবং সাইবার গোয়েন্দা ক্ষমতা অর্জন করে। সংগঠনটি মেক্সিকোর প্রায় সব রাজ্যে উপস্থিতি বজায় রাখে এবং তার শাসন বজায় রাখতে সহিংসতা, ভয় এবং কৌশলগত আক্রমণ ব্যবহার করে। এই পদ্ধতি তাকে আন্তর্জাতিক মাদক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় করে তুলেছে।
এল মেনচোর মৃত্যু পরই মার্কিন সরকার ও কানাডিয়ান সরকার উভয়ই মেক্সিকো ভ্রমণ সংক্রান্ত জরুরি সতর্কতা জারি করে। উভয় সরকারই নাগরিকদেরকে মেক্সিকোর নির্দিষ্ট অঞ্চল, বিশেষ করে যেখানে CJNG সক্রিয়, সেখানে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানায়।
এই সতর্কতার ফলে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন মেক্সিকো গন্তব্যের ফ্লাইট বাতিল বা পুনঃনির্ধারণ করে। এয়ারলাইনগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সম্ভাব্য হোস্টেজের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
মেক্সিকো সরকারের পক্ষ থেকে এই ঘটনার পর তদন্তের জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্সটি এল মেনচোর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, CJNG এর সামরিক ক্ষমতা হ্রাস এবং দেশের নিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করছে।
অধিকন্তু, মার্কিন ও কানাডিয়ান সরকার উভয়ই মেক্সিকোর সঙ্গে তথ্য শেয়ারিং ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এই সহযোগিতা ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ সংগঠনের আক্রমণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মেক্সিকোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থির রয়ে গেছে, এবং CJNG এর প্রতিক্রিয়া এখনও চলমান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সংগঠনের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে দমন করা কঠিন বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।



