১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত তিনটায়, সৌদি আরবের আবহা শহরে ওমরাহ শেষ করার পর ফেরার পথে একটি গাড়ি সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণ নেওয়া হয়। গাড়িটি রোডে হারিয়ে যাওয়ার ফলে পুরো পরিবার ধ্বংসের মুখে পড়ে, যার মধ্যে রয়েছে ৮ বছর বয়সী ফাইজা আক্তার, যিনি একমাত্র বেঁচে গেছেন। ফাইজা রামগঞ্জ উপজেলার ভাটরা ইউনিয়নের নলচরা গ্রাম থেকে, রামগঞ্জ টিউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৪২ বছর বয়সী পিতা মিজানুর রহমান, ৩০ বছর বয়সী মা মেহের আফরোজ সুমি, বড় বোন ১৩ বছর বয়সী মোহনা এবং দেড় বছরের শিশু সুবাহ। সকলের দেহ জেদ্দা শহরের একটি হাসপাতালের মরগে রাখা হয়েছে এবং বাংলাদেশে তাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান।
ফাইজা আক্তার দুর্ঘটনার পর সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি হননি; তার শরীরে এখনও জখমের দাগ দেখা যায় এবং চলাফেরায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষাকাল এখনও চলমান, তবে শারীরিক অবস্থা ও মানসিক শক তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে বাধা দিচ্ছে।
দুর্ঘটনার পরপরই ফাইজার মামা তানভীর হোসেন তাকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। তারা গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটায় কায়রো থেকে রওনা হয়ে আজ সকালে রামগঞ্জের গ্রাম বাড়িতে পৌঁছান। গাড়ি যাত্রা জুড়ে ফাইজা নীরব ছিল, তার মুখে কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে।
ফাইজা বাড়িতে পৌঁছানোর পর তার শারীরিক অবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে; তার পায়ে ও কাঁধে রক্তপাতের দাগ দেখা যায় এবং হাঁটতে কিছুটা অসুবিধা হয়। তবে সে এখনও ছোটবেলা মতোই সরলভাবে তার বাবা-মা ও বোনদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে আশাবাদী। সে বিশ্বাস করে যে, তাদের সবগুলোই হাসপাতালে ভর্তি আছে এবং শীঘ্রই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে।
ফাইজার আত্মীয়দের মতে, এখনও পর্যন্ত পরিবারকে মৃতদের খবর জানানো হয়নি। তারা জানে যে, দুর্ঘটনার পরপরই পিতামাতা ও বোনদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, তবে সঠিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। এই অনিশ্চয়তা পরিবারকে গভীর দুঃখে ভাসিয়ে রেখেছে, যদিও ফাইজা নিজে এখনও পুরো সত্য জানে না।
মামা তানভীর হোসেন জানান, মৃতদের দেহ বর্তমানে জেদ্দার হাসপাতালের মরগে রয়েছে এবং তাদের দেশে আনার জন্য কূটনৈতিক ও কনসুলার প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ রায়হান দ্যূতাবাসের কনসুলার কর্মীরা ইতিমধ্যে মৃতদেহের রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করেছে এবং সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করছে।
সৌদি আরবের মন্ত্রণালয়ও এই দুর্ঘটনা সম্পর্কে জানিয়ে দায়িত্ব স্বীকার করেছে এবং ভবিষ্যতে হজ্জ ও ওমরাহ সফরের সময় সড়ক নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে রায়হান দ্যূতাবাসের প্রধান বিদেশী বিষয়ক কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন, “সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে, আমরা মৃতদেহের দ্রুত রপ্তানি এবং বেঁচে থাকা পরিবারের জন্য যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করব।”
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেন, হজ্জ ও ওমরাহ পর্যটনের সময় সড়ক দুর্ঘটনা একটি গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে বৃহৎ সংখ্যক মুসলিম দেশীয় ভ্রমণকারীর চলাচলকে বিবেচনা করলে। তারা যুক্তি দেন, সৌদি আরবের সড়ক অবকাঠামো ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
দুই দেশের কূটনৈতিক সংলাপের অংশ হিসেবে, বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে রায়হান দ্যূতাবাসের মাধ্যমে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। এতে পাইলট ট্যুর গাইড, জরুরি যোগাযোগ নম্বর এবং স্বাস্থ্য সেবা সুবিধার তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্ঘটনা কমাতে সহায়তা করবে।
ফাইজা ও তার আত্মীয়দের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল শোকের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং শারীরিক পুনর্বাসন সম্পন্ন করা। সরকারী ও বেসরকারি সংস্থাগুলি ইতিমধ্যে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং পুনর্বাসন সেবা প্রদান করার পরিকল্পনা করেছে। একই সঙ্গে, মৃতদের দেহের পুনরায় দেশে আনার প্রক্রিয়া দ্রুততর করার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এই দুঃখজনক ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যটন ও ধর্মীয় সফরের নিরাপত্তা নিয়ে পুনরায় আলোচনা উত্থাপন করেছে। দু’দেশের কূটনৈতিক সংযোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে সড়ক নিরাপত্তা, জরুরি সেবা এবং কনসুলার সহায়তা শক্তিশালী করা হবে, যাতে অনুরূপ ট্র্যাজেডি আর না ঘটে।



