নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত রসায়নবিদের নতুন উদ্ভাবন বায়ু থেকে সরাসরি পানির উৎপাদন সম্ভব করেছে, যা একক ইউনিটে দিনে এক হাজার লিটার পর্যন্ত পরিষ্কার পানি সরবরাহ করতে পারে। এই যন্ত্রটি প্রায় ২০ ফুট লম্বা শিপিং কন্টেইনারের সমান আকারের এবং খুব কম তাপমাত্রার তাপশক্তি ব্যবহার করে কাজ করে, ফলে বিদ্যুৎ গ্রিড বা বিদ্যমান পানির নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল নয়।
প্রফেসর ওমর ইয়াগি, ২০২৫ সালের রসায়ন নোবেল বিজয়ী, রেটিকুলার কেমিস্ট্রি ব্যবহার করে এমন উপাদান তৈরি করেছেন যা শুষ্ক বা মরুভূমি পরিবেশেও বায়ুতে লুকিয়ে থাকা আর্দ্রতা শোষণ করতে সক্ষম। এই উপাদানগুলো সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত কাঠামো নিয়ে গঠিত, যা বায়ু থেকে জলীয় বাষ্পকে আকর্ষণ করে এবং কম তাপমাত্রার তাপশক্তি দিয়ে তা তরলে রূপান্তরিত করে।
প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হল এর স্বয়ংসম্পূর্ণতা। কন্টেইনারের আকারের ইউনিটটি কোনো কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ছাড়াই কাজ করে এবং স্থানীয় তাপ উৎস, যেমন সূর্যালোক বা পার্শ্ববর্তী শিল্পের তাপ, ব্যবহার করে পানির উৎপাদন চালায়। একক ইউনিটের সর্বোচ্চ উৎপাদন ক্ষমতা এক হাজার লিটার, যা ছোট গ্রাম বা দ্বীপের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে পানি সরবরাহ করতে পারে।
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্যারিকেন মেলিসা ও বেরিলের মতো তীব্র ঝড়ের ফলে ব্যাপক বন্যা, ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে, এবং বহু মানুষের মৌলিক পানীয় জলের সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থিতিশীল এবং বিকল্প পানির উৎসের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গ্রেনাডার ক্যারিয়াকু ও পেটিট মার্টিনিক দ্বীপগুলোতে ২০২৪ সালের হারিকেন বেরিলের পরেও পানির ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই নতুন যন্ত্রকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে, কারণ এটি দ্রুত স্থাপনযোগ্য এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়।
স্থানীয় সরকারিক কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে, দূর থেকে পানি আমদানি করা ব্যয়বহুল, কার্বন নির্গমন বাড়ায় এবং দূষণের ঝুঁকি থাকে। কেন্দ্রীয় পানির ব্যবস্থা ঝড়ের সময় সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর বিকেন্দ্রীভূত ইউনিটগুলো এমন পরিস্থিতিতে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। তাই এই প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদী জল নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ইয়াগি নিজেই জর্ডানের শুষ্ক অঞ্চলে বড় হয়েছেন, যেখানে পানির অভাব দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এই অভিজ্ঞতা তাকে এমন একটি বিজ্ঞান তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যা পদার্থের গঠন পুনর্গঠন করে বায়ু থেকে সরাসরি পানি সংগ্রহের সক্ষমতা দেয়। তিনি আন্তর্জাতিক নেতাদেরকে জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবেলায় বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনকে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সাম্প্রতিক জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বজনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এমন দেশে বসবাস করে যেখানে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। প্রায় ২.২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদে ব্যবস্থাপিত পানীয় জলের অভাবে বেঁচে আছে, আর চার বিলিয়ন মানুষ তীব্র পানির ঘাটতির সম্মুখীন। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে, জলসম্পদে সংকটের মাত্রা কতটা ব্যাপক।
যদি এই বায়ু-থেকে-জল উৎপাদন যন্ত্রগুলো ব্যাপকভাবে স্থাপন করা যায়, তবে শুষ্ক অঞ্চল, দ্বীপপুঞ্জ এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় পানির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। দীর্ঘ দূরত্বে পানি পরিবহন করার প্রয়োজন হ্রাস পাবে, ফলে পরিবহন খরচ ও কার্বন নির্গমন দুটোই কমে যাবে।
প্রযুক্তিটি এখনও স্কেলিং পর্যায়ে রয়েছে, তবে এর কার্যকারিতা এবং পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্য এটিকে ভবিষ্যতে জল সংকট মোকাবেলায় একটি বাস্তবিক সরঞ্জাম হিসেবে তুলে ধরেছে। স্থানীয় নীতি নির্ধারকরা কীভাবে এই বিকেন্দ্রীভূত সমাধানকে সমর্থন ও প্রচার করতে পারেন, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
আপনার এলাকায় যদি জলসম্পদের ঘাটতি থাকে, তবে এই ধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণ পানি উৎপাদন ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলা উচিত।



