খাগড়াছড়ি জেলার এক ছোট গ্রামে দাদী তার নাতিকে ককবোরক ভাষায় খাবারের আহ্বান জানালেন, কিন্তু শিশুটি চকমা ভাষায় উত্তর দিল। দাদী বুঝতে পারলেও নাতি নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে দ্বিধা করল। এই দৃশ্যটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের ভাষা সংরক্ষণ সমস্যার প্রতিফলন।
ককবোরক শব্দের অর্থ “জনগণের ভাষা” এবং এটি সাইনো-টিবেটান ভাষা পরিবারভুক্ত। মূলত ত্রিপুরা জনগণের মাতৃভাষা হিসেবে পরিচিত, এই ভাষা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রচলিত। বহু প্রজন্ম ধরে এটি মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, তবে লিখিত রূপে তার বিকাশ সীমিত।
বাংলাদেশে ককবোরকের লিখিত ও সাহিত্যিক উন্নয়ন এখনো প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। ভারতের তুলনায় এখানে কোনো ব্যাপক ব্যাকরণ সংকলন, পাঠ্যপুস্তক বা মানক শিক্ষাসামগ্রী উপলব্ধ নয়। অধিকাংশ যোগাযোগ মৌখিকভাবে হয় এবং এখনও কোনো একক মানক লিপি গৃহীত হয়নি।
লেখা-লেখার অভাবের ফলে ভাষার সাহিত্যিক ভাণ্ডারও ক্ষুদ্র। কিছু কবিতা ও ছোটগল্প রচিত হলেও সেগুলো সংখ্যায় কম এবং বিস্তৃত পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রথম ককবোরক বই প্রকাশের পরেও, প্রকাশনা ও বিতরণ ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
স্থানীয় কিছু মানুষ রোমান লিপি ব্যবহার করে শব্দ রেকর্ড করার চেষ্টা করছেন, তবে তা একরূপে গৃহীত হয়নি। অন্যদিকে, ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে ককবোরকের জন্য একটি স্বীকৃত লিপি তৈরি করা হয়েছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা হয়। এই পার্থক্যই ভাষার উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
সরকারি ও সমাজসেবী সংস্থাগুলো সম্প্রতি ককবোরকের লিখিত রূপ গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত কাজ শুরু করেছে। ভাষা নীতি প্রণয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি এবং স্থানীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে আর্থিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে ককবোরককে মাধ্যমিক স্তরে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এখনো তা পরীক্ষামূলক পর্যায়ে। শিক্ষার্থীরা যদি তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা পায়, তবে ভাষার ব্যবহার বাড়বে এবং পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে তা পুনরুজ্জীবিত হবে।
স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোতে ককবোরক ভাষায় মৌলিক পাঠ্যপুস্তক তৈরি করা শুরু হয়েছে, তবে এই উপকরণগুলো সীমিত সংখ্যায় উৎপাদিত হয় এবং অধিকাংশ স্কুলে এখনও বাংলা ও ইংরেজি প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ককবোরকের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। ভাষা সংরক্ষণে পরিবারিক পরিবেশে নিয়মিত ব্যবহার, স্থানীয় উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভাষার প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষা বিভাগে কাজ করা অভিজ্ঞ প্রতিবেদক হিসেবে দেখা যায়, ভাষা সংরক্ষণে নীতি, শিক্ষা ও সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া টেকসই ফলাফল অর্জন কঠিন।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: যদি আপনার পরিচিত কোনো পরিবার ককবোরক ব্যবহার করে, তবে তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথোপকথন করুন, ছোট গল্প শেয়ার করুন এবং স্থানীয় ভাষা ক্লাবের অংশ হন। এভাবে ভাষা জীবিত থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে।



