২০২৪ সালের শেষের দিকে গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের সময় “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” ও “আজাদি” শব্দগুলো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে, পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসলেও এই শব্দগুলো আবার রাজনীতির মঞ্চে উঠে আসে। সরকার, ভাষাবিদ ও দলীয় নেতারা এখন এই শব্দগুলোর ব্যবহার, তাৎপর্য ও ভাষাগত প্রভাব নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন।
অভ্যুত্থানের সময় ছাত্ররা রাস্তায় নেমে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, “আজাদি”, “ইনসাফ” ইত্যাদি স্লোগান উচ্চারণ করে, যা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায়। আন্দোলন দমনের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসলেও, এই শব্দগুলো সামাজিক মিডিয়া ও ক্যাম্পেইনে পুনরায় দেখা যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু রাজনৈতিক বক্তা তাদের ভাষণে এই শব্দগুলো জোরে ব্যবহার করছেন, আবার অন্যরা দাবি করছেন যে পূর্বে প্রচলিত না থাকা শব্দগুলো এখন ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পার্থক্যই বিতর্কের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের একজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন, “ইনকিলাব, আজাদি ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে বাংলা ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই” এবং এ ধরনের শব্দের ব্যবহারকে ভাষা নীতি লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। তিনি ভাষা সংরক্ষণের জন্য কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
অন্যদিকে, ভাষাবিদরা এই মতামতকে প্রত্যাখ্যান করে বলছেন যে এই শব্দগুলো ভাষার গঠনকে বিকৃত করছে না এবং কোনো হুমকি সৃষ্টি করছে না। তাদের মতে, এই শব্দগুলো মূলত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে খুব কমই শোনা যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশি শব্দের সংযোজনের উদাহরণ প্রচুর। “আওয়ামী লীগ”, “কমিউনিস্ট”, “ইউনিয়ন” ইত্যাদি শব্দগুলো সময়ের সাথে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। তেমনি “ইত্তেফাক” ও “ইনকিলাব” শব্দের ব্যবহার করে জাতীয় পত্রিকার নামকরণও হয়েছে।
বিশেষ করে “ইনকিলাব” শব্দের ব্যবহার সর্বাধিক আলোচিত হয়েছে। আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আন্দোলনকারীরা তাদের র্যালি ও সমাবেশে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ”, “আজাদি”, “বন্দোবস্ত” ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে তীব্রতা বাড়িয়েছেন। এই শব্দগুলো টেলিভিশন টকশো ও জনসমাবেশে নিয়মিত শোনা যায়।
“ইনকিলাব মঞ্চ” নামে একটি প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠা এই সময়ে ঘটেছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা ওসমান হাদি নির্বাচনের প্রচারকালে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর এই মঞ্চের নাম রাজনৈতিক আলোচনায় আরও বেশি শোনা যায়।
ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ জাতীয় নাগরিক দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের অধিকাংশ নেতা তাদের বক্তব্যের শেষে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” স্লোগান ব্যবহার করেন। এই ব্যবহারকে দলের সমর্থকরা আন্দোলনের চেতনা বজায় রাখার উপায় হিসেবে তুলে ধরেন।
উল্লেখযোগ্য যে, একই স্লোগান ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ও ব্যবহার করে, যার অর্থ “বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক”। এই আন্তর্জাতিক সমান্তরাল শব্দের ব্যবহার দেশীয় বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিএনপির জাতীয় নেতৃত্বের কিছু সদস্যও সাম্প্রতিক সমাবেশে “ইনকিলাব” ও “আজাদি” শব্দ ব্যবহার করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তাদের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে, ফলে বিতর্কের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, এই ধরনের শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার ভোটারদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং নির্বাচনী প্রচারণায় ভাষা সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হলে রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তেজিত করতে পারে। তাই পার্টিগুলো ভবিষ্যতে তাদের রেটোরিক পরিবর্তন করতে পারে।
সর্বশেষে, ভাষা ও রাজনীতির সংযোগে এই বিতর্ক অব্যাহত থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সরকার, ভাষাবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে এই শব্দগুলোকে নিয়ন্ত্রণ বা গ্রহণ করবে, তা দেশের জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



