রমজান মাসে টাঙ্গাইল জেলায় লেবুর চাহিদা তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায়, দাম এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান দেখা দিয়েছে। ইফতারের সময় শরবত প্রস্তুত করার জন্য লেবুর চাহিদা বৃদ্ধি পেলে, মৌসুমের বাইরে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম দ্রুত উঁচুতে উঠে।
স্থানীয় বাজারে পাইকারি স্তরে এক মণ (প্রায় ৪০ কেজি) লেবু ৬,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা প্রতি কেজি ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি করছেন, কিছু বাজারে এক হালি (প্রায় ১০ কেজি) লেবু ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্রেতারা অভিযোগ করছেন যে, কিছু গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে।
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলা লেবু চাষের প্রধান কেন্দ্র, যেখানে বৃহৎ পরিসরে বাগান রয়েছে। সখিপুর, মির্জাপুর, ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলাতেও লেবুর বাগান বিস্তৃত। এই অঞ্চলগুলো থেকে লেবু ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়, ফলে টাঙ্গাইলের লেবু বাজারে প্রাধান্য পায়।
লেবু চাষে তুলনামূলকভাবে কম শ্রম ও কম ইনপুট খরচের কারণে কৃষকরা এই ফসলকে আকর্ষণীয় বলে মনে করেন। রোগবালাই কম, গাছের আয়ু দীর্ঘ এবং ধানের মতো অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভের মার্জিন বেশি। এ কারণে অনেক কৃষক ধান ও অন্যান্য শস্যের পরিবর্তে লেবু চাষে ঝুঁকছেন। দেলদুয়ারের কিছু চাষী, যেমন আব্দুল বাতেন, রহিম ও বাদশা, উল্লেখ করেছেন যে রমজানে চাহিদা বেশি থাকলেও মৌসুমের বাইরে উৎপাদন কম থাকায় দাম বেড়েছে, এবং বর্তমানে তারা প্রতি মণ ৬,০০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
বাগানের শ্রমিকরা জানান, তারা প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গাছের পরিচর্যা ও ফল তোলার কাজ করেন। তবে মৌসুম না থাকায় ফলন কমে গেছে, তবুও ছোট ছোট লেবু সংগ্রহ করে বাজারে পাঠানো হচ্ছে। শ্রমিকদের কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে, বাজারে লেবুর সরবরাহের ঘাটতি কমাতে তারা অতিরিক্ত পরিশ্রম করছেন।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর টাঙ্গাইল জেলায় মোট ১,০২৫ হেক্টর জমিতে লেবু চাষ করা হয়েছে। লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে ১২,৫০০ মেট্রিক টন উৎপাদনের, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আশিক পারভেজ জানান, টাঙ্গাইল লেবু উৎপাদনে দেশের শীর্ষে রয়েছে এবং কৃষি বিভাগ আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, বিনামূল্যে চারা ও সার বিতরণসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে সারা বছর চাষযোগ্য এলাকা বৃদ্ধি পাবে, যা মৌসুমের বাইরে সরবরাহের ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রমজানের মতো ধর্মীয় উৎসবে লেবুর চাহিদা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তবে সরবরাহের ঘাটতি ও বাজারে একাধিক বিক্রেতার সমন্বিত কাজ দামকে অস্থির করে তুলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি যদি সমাধান না করা হয়, তবে দাম আরও উঁচুতে উঠতে পারে, যা ভোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে। সরকার ও কৃষি বিভাগকে সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করে, মৌসুমের বাইরে উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনা প্রদান করা জরুরি।
সংক্ষেপে, রমজানে টাঙ্গাইলের লেবুর চাহিদা ও সরবরাহের অমিলের ফলে দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। কৃষক ও শ্রমিকরা উচ্চ দামের সুবিধা পাচ্ছেন, তবে ভোক্তাদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন বৃদ্ধি, আধুনিক চাষাবাদ ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।



