নির্বাচনের পর নিষিদ্ধ করা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে বিভিন্ন জেলায় নেতাকর্মীরা প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মে মাসে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেয়। ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি, তবে ভোটের পরপরই ঢাকা ও অন্যান্য জেলা-উপজেলায় নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে মিডিয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েকটি স্থানে কার্যালয় পুনরায় খুলতে গিয়ে পাল্টা দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে দলীয় নির্দেশনা নাকি ব্যক্তিগত উদ্যোগ, অথবা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে কিনা, তা নিয়ে বিভিন্ন স্তরে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
আফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, দলীয় কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জানান যে নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা কোনো কার্যালয় নেই এবং তাই সেখানে যাওয়া রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে স্বাভাবিক। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশের প্রত্যাশায় কার্যালয়ে গিয়ে কাজ করছেন এবং শীঘ্রই বর্তমান সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।
দলীয় সূত্রের মতে, শীঘ্রই ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে, শেখ হাসিনা দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় খুলতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনা অনুসরণ করে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীরা ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্যোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। ছাত্রলীগের কর্মী রিহান সরদার জানান, কেন্দ্রীয় বার্তা পাওয়ার পর থেকে এই প্রবণতা বাড়ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। কিছু সূত্র দাবি করে, নির্বাচনের আগে ভোটের সমর্থন বাড়ানোর লক্ষ্যে বিএনপি বা জামায়াত-এ-ইসলামির কিছু প্রভাবশালী নেতা স্থানীয় জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, নির্বাচনের পর কার্যালয় খোলার বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিয়েছেন। তবে একই দলের অন্য গোষ্ঠী বাধা দেওয়ায় কিছু এলাকায় সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
রাজধানীতে প্রতীকী উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে কয়েকজন নেতাকর্মী জাতীয় পতাকা টেনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতি রাজনৈতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এই ধরনের প্রকাশ্য উপস্থিতি দলীয় নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রকাশের পাশাপাশি সরকারের প্রতি চাপে বাড়ানোর উদ্দেশ্য বহন করে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন।
দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কার্যালয় পুনরায় চালু করা স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে গণ্য হয়। অন্যদিকে, বিরোধী দল ও কিছু স্থানীয় গোষ্ঠী এই পদক্ষেপকে আইনবিরোধী ও অশান্তিকর বলে সমালোচনা করে, যা স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামির কিছু স্থানীয় নেতা, যদিও প্রকাশ্যে সমর্থন না দিলেও, নির্বাচনের পর কার্যালয় খোলার বিষয়ে কিছুটা সমঝোতা করার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এই সমঝোতা স্পষ্ট না হওয়ায়, কিছু এলাকায় দলীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ বাড়ছে এবং তা ভাঙচুরে রূপ নিচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু জেলায় কার্যালয় পুনরায় খোলার পর স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়িয়ে তুলেছে। তবে নিরাপত্তা গ্যাপের কারণে কিছু এলাকায় হিংসাত্মক সংঘর্ষ ঘটেছে, যেখানে গৃহস্থালির সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দলীয় সূত্রের মতে, শীঘ্রই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে ভার্চুয়াল আলোচনা চালিয়ে, তৃণমূলের সক্রিয়তা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সমন্বয় করা হবে। একই সঙ্গে, সরকারকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে, নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ কী হবে তা এখনো অনিশ্চিত। যদি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হয়, তবে দলীয় নেতাদের অব্যাহত উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, যদি সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তবে কার্যালয় পুনরায় চালু হয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক পথে ফিরে আসতে পারে।
সারসংক্ষেপে, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ কার্যালয় পুনরায় খোলার প্রচেষ্টা রাজনৈতিক সমঝোতা, দলীয় নির্দেশনা ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের মিশ্রণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়টি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতে কীভাবে সমাধান হবে তা সময়ই বলবে।



