চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় হালিমা মঞ্জিল নামের ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলায় গ্যাস জমে বিস্ফোরণ ঘটায়, ফলে শিশুসহ মোট নয়জন দগ্ধ হয়েছেন। ঘটনাটি সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোরবেলায় ঘটেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা তৎক্ষণাৎ আতঙ্কে চিৎকার করে সাহায্য চায়।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের সঞ্চয় ঘটার মূল কারণ ছিল রান্নাঘরে সঠিকভাবে বায়ু চলাচল না হওয়া। গ্যাসের সঞ্চয় পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছালে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে, যা ঘরের ভিতরে থাকা নারী ও শিশুরা সহ বেশ কয়েকজনকে দগ্ধ করে।
বিস্ফোরণের পরপরই ফায়ার সার্ভিসের দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দগ্ধ ব্যক্তিদের তৎক্ষণাৎ উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত রোগীদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে রোগীদের শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি এবং ত্বকের ব্যাপক দাগের জন্য জরুরি চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ জানান, দগ্ধ রোগীদের শ্বাসনালীর ক্ষতি গুরুতর এবং ত্বকে ব্যাপক পোড়া দেখা গেছে। তিনি উল্লেখ করেন, রোগীদের শ্বাসনালীর ক্ষতি দ্রুত সঠিক অক্সিজেন সাপোর্টের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, দগ্ধদের মধ্যে রানি ও পাখি নামের দুই নারী এবং সাখাওয়াত নামের এক ব্যক্তি সম্পূর্ণ দগ্ধ, অর্থাৎ শরীরের ১০০ শতাংশ পোড়া হয়েছে। এছাড়া একজন রোগীর দাগ প্রায় ৮০ শতাংশ, আর অন্যজনের ৪৫ শতাংশ দাগ হয়েছে। বাকি রোগীদের দাগের পরিমাণ ২০ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে।
দগ্ধ রোগীদের শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি এবং ত্বকের দাগের মাত্রা অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শ্বাসনালীর ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেন থেরাপি ব্যবহার করা হচ্ছে, আর ত্বকের দাগের জন্য ত্বরিত ড্রেসিং ও অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি চালু করা হয়েছে।
চিকিৎসা দল রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে শল্যচিকিৎসা করা হবে। বিশেষ করে সম্পূর্ণ দগ্ধ রোগীদের জন্য ত্বকের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। রোগীদের পরিবারকে অবহিত করা হয়েছে এবং তাদের মানসিক সহায়তার জন্য কাউন্সেলিং সেবা প্রদান করা হবে।
এই ধরনের গ্যাস সংক্রান্ত দুর্ঘটনা রোধে নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলা জরুরি। গ্যাস ব্যবহার করার সময় যথাযথ বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, গ্যাস লিকের লক্ষণ দেখা মাত্রই ব্যবহার বন্ধ করে পেশাদার টেকনিশিয়ানকে ডাকা উচিত। এছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার ও পাইপলাইন নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং গ্যাসের সঠিক সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা অপরিহার্য।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গ্যাস সংক্রান্ত নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনর্বিবেচনা করার কথা জানিয়েছে। ভবনের মালিক ও বাসিন্দাদেরকে গ্যাস ব্যবহার সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য প্রশিক্ষণ ও তথ্যবহুল সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
দগ্ধ রোগীদের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি ও ত্বকের দাগের তীব্রতা বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন হবে। চিকিৎসা দল রোগীদের শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধারের জন্য সমন্বিত সেবা প্রদান করতে প্রস্তুত।
এই ঘটনার পর, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গ্যাস ব্যবহারকারী সকলকে সতর্ক করেন যে, গ্যাসের গন্ধ বা অস্বাভাবিক শোর উপস্থিতি হলে তা অবিলম্বে জানিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। গ্যাস লিকের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হল হালকা গন্ধ, শ্বাসে অস্বস্তি এবং ত্বকে হালকা জ্বালাপোড়া অনুভূতি।
গ্যাস সংক্রান্ত দুর্ঘটনা রোধে বাড়িতে গ্যাস ডিটেক্টর স্থাপন করা একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। ডিটেক্টর গ্যাসের ক্ষুদ্র পরিমাণ সনাক্ত করেই সতর্কতা সংকেত দেয়, ফলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
অবশেষে, দগ্ধ রোগীদের দ্রুত সঠিক চিকিৎসা পাওয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। সম্প্রদায়ের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা মানদণ্ডের কঠোর অনুসরণই ভবিষ্যতে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়ক হবে।
আপনার বাড়িতে গ্যাস ব্যবহার সংক্রান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি যথাযথ? সময়মতো পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করুন, যাতে অনুরূপ দুর্ঘটনা এড়ানো যায়।



