বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC) আজ ফার্নেস অয়েলের নতুন ইউনিট মূল্য ঘোষণায় ১৮ শতাংশ হ্রাস করে লিটারে ৭০.১০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এই নতুন হার আগামীকাল মধ্যরাতে কার্যকর হবে এবং পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা ও শিল্পখাতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
পূর্বে ফার্নেস অয়েলের দাম ৮৬ টাকা লিটারে স্থির ছিল, যা শেষ এক বছর অর্ধেক সময়ের জন্য পরিবর্তনহীন রয়ে গিয়েছিল। দাম নির্ধারণের দায়িত্ব পূর্বে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (BPC) নিজে পালন করত, তবে BERC এখন প্রথমবারের মতো নিয়মিত হারের কাঠামো প্রণয়ন করেছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে গত মাসে অনুষ্ঠিত একটি পাবলিক হিয়ারিংয়ের ফলাফল রয়েছে। ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত শুনানিতে বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (BPDB) BPC-কে অতিরিক্ত চার্জের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। BPDB দাবি করে যে, গত এক বছর অর্ধেক সময়ে BPC প্রকৃত সরবরাহ মূল্যের তুলনায় ৬৪৪ কোটি টাকা বেশি চার্জ করেছে।
BPDB আরও জানায় যে, ঐ সময়ে BPC ফিক্সড দাম ৮৬ টাকা লিটারে বজায় রেখেছিল, যদিও তার ক্রয়মূল্য মাসভিত্তিক ৫৭ থেকে ৮৩ টাকা লিটারের মধ্যে পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই পার্থক্যকে ভিত্তি করে BPDB ফার্নেস অয়েলের দাম ৫০.৮৩ টাকা লিটারে নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়।
অন্যদিকে BPC নিজে দাম হ্রাসের ক্ষেত্রে সংযত অবস্থান গ্রহণ করে। BPC প্রস্তাব করেছিল যে, দাম মাত্র এক টাকা কমিয়ে ৮৫ টাকা লিটারে স্থির করা হোক। এই প্রস্তাবের পরেও BERC সর্বশেষ সিদ্ধান্তে দামকে ৭০.১০ টাকা লিটারে নির্ধারণ করে, যা উভয় পক্ষের দাবির মাঝামাঝি একটি সমঝোতা হিসেবে দেখা যায়।
BERC সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তেল কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা এবং স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের জন্য মার্জিন ও ট্রান্সমিশন চার্জ যথাক্রমে ০.৭১ টাকা এবং ১.২০ টাকা নির্ধারিত হবে। এই চার্জগুলো মূল দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শেষ গ্রাহকের জন্য মোট মূল্য গঠন করবে।
BPC প্রতি বছর প্রায় ৮-৯ লাখ টন ফার্নেস অয়েল বিক্রি করে, যার বেশিরভাগই পাবলিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা এবং কিছু প্রাইভেট জেনারেটর ও শিল্পখাতে সরবরাহ করা হয়। এই পরিমাণের ভিত্তিতে দাম হ্রাসের ফলে শক্তি খাতের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, ফার্নেস অয়েলের দাম কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচে সাশ্রয় ঘটাবে। এই সাশ্রয় বিদ্যুৎ বিক্রেতাদের জন্য মূল্য নির্ধারণে নমনীয়তা এনে দিতে পারে এবং শেষ গ্রাহকের জন্য বিদ্যুৎ ট্যারিফে সম্ভাব্য হ্রাসের পথ খুলে দিতে পারে।
অয়েল ট্রেডার ও সরবরাহ চেইনের অন্যান্য অংশীদারদের জন্য মার্জিনের চাপ বাড়তে পারে, কারণ কম দামে বিক্রয় করতে হলে ক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণে আরও দক্ষতা প্রয়োজন হবে। BPC-কে এখন তার ক্রয় প্রক্রিয়া ও লজিস্টিক্সে খরচ কমানোর পদক্ষেপ নিতে হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে দাম হ্রাসের ফলে লাভের মার্জিন ক্ষয় না হয়।
দীর্ঘমেয়াদে BERC যদি নিয়মিতভাবে দাম পর্যালোচনা চালিয়ে যায়, তবে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং অপ্রত্যাশিত মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি কমবে। তবে, যদি আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের ওঠানামা বা দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পায়, তবে ভবিষ্যতে আবার দাম সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, BERC-এর এই দাম হ্রাস বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের জন্য তাত্ক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি এনে দেবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে খরচ নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ দক্ষতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এই সেক্টরের টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হিসেবে রয়ে যাবে।



