গাইবান্ধা জেলার রঙপুরি ও কামতাপুরি উপভাষা, যা স্থানীয় মানুষ দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয় হিসেবে ব্যবহার করে আসছে, আজ দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার পথে। আধুনিক শহুরে জীবনযাপন, প্রমিত বাংলা শিক্ষার আধিপত্য এবং মিডিয়ার প্রভাব এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
ঐ উপভাষা ইন্দো‑ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো‑আর্য শাখা থেকে উদ্ভূত এবং গাইবান্ধার ইতিহাসে গভীর শিকড় রয়েছে। প্রাচীনকালে ঘোড়াঘাটকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সময়ে, এই ভাষা স্থানীয় জনগণের দৈনন্দিন যোগাযোগের মূল মাধ্যম ছিল। গাইবাঁধা শব্দের উৎপত্তি, যা গাভী বেঁধে রাখার স্থান নির্দেশ করে, এই সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
সময়ের সাথে সাথে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রমিত বাংলার ব্যবহার বাড়ার ফলে, রঙপুরি‑কামতাপুরি উপভাষার ব্যবহার ধীরে ধীরে কমে এসেছে। স্কুল ও কলেজে বাংলা ভাষার পাঠ্যক্রমের প্রাধান্য, পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের নতুন ভাষা পছন্দের পরিবর্তন, এই উপভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করছে।
শিক্ষা বৃদ্ধি পেলে মানুষ প্রায়শই প্রচলিত ভাষা ব্যবহারকে পুরোনো বা অশিক্ষিত হিসেবে দেখার প্রবণতা গড়ে ওঠে। ফলে, মাতৃভাষা হিসেবে শৈশবে শোনা গানের ও কথার ধারাবাহিকতা ভাঙে এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই উপভাষার ব্যবহার হ্রাস পায়।
স্থানীয় সাহিত্যিক ও কবিরা এই প্রবণতাকে সাংস্কৃতিক ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করছেন। তারা বলেন, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গবেষণার অভাবের ফলে শব্দভাণ্ডার ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে। তরুণদের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষাকে অশিক্ষিতের চিহ্ন হিসেবে ভুল ধারণা গড়ে উঠছে, যদিও এটি তাদের মা-বাবার কথার স্বাভাবিক অংশ।
এই সংকটের মাঝেও কিছু তরুণ সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২৬ বছর বয়সী মঞ্জু মিয়া, সামাজিক মিডিয়ায় রঙপুরি‑কামতাপুরি গানের ও নাটকের ভিডিও প্রকাশ করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তিনি ছোটবেলায় বিয়ের অনুষ্ঠানে শোনা ঐতিহ্যবাহী গীতগুলোকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরছেন, যা দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাচ্ছে।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবুল আকতার ভাষা সংরক্ষণের জন্য পরিবারিক পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। তিনি উল্লেখ করেন, শিশুরা যদি বাড়িতে নিয়মিত এই উপভাষা শোনে এবং ব্যবহার করে, তবে তা ভবিষ্যতে টিকে থাকবে।
স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ভাষা সংরক্ষণে ভূমিকা নিতে পারে। পাঠ্যক্রমে আঞ্চলিক শব্দ ও বাক্যাংশ অন্তর্ভুক্ত করা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে উপভাষা ব্যবহার উৎসাহিত করা এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণা প্রকল্পের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা কার্যকর হতে পারে।
মিডিয়া ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি। স্থানীয় রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যদি উপভাষায় সংবাদ বা বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম তৈরি করে, তবে তা বৃহত্তর শ্রোতার কাছে পৌঁছাবে এবং ব্যবহারিক মূল্য বাড়বে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি ব্যবহার করে তরুণরা উপভাষার প্রচার বাড়াতে পারে। হ্যাশট্যাগ চালু করা, ছোট ভিডিও চ্যালেঞ্জ বা কবিতা প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে ভাষা জীবন্ত রাখা সম্ভব।
অবশেষে, ভাষা সংরক্ষণে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি নীতি সমর্থন প্রয়োজন। আঞ্চলিক ভাষা গবেষণার জন্য তহবিল বরাদ্দ, ভাষা সংরক্ষণ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় সংস্কৃতি উৎসবের সমর্থন এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
আপনার এলাকার কোনো অনন্য ভাষা বা উপভাষা কি আছে? সেটি সংরক্ষণের জন্য আপনি কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন, তা নিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করুন।



