পাকিস্তান গত রাত্রি এফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে একাধিক বিমান হামলা চালায়, যার ফলে তালেবান জানিয়েছে যে নারীর ও শিশুর সহ শতাধিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে। পাকিস্তানের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় দাবি করে যে এই আক্রমণগুলো সাতটি সন্দেহভাজন সশস্ত্র শিবির ও গোপন ঘাঁটি লক্ষ্য করে করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের পেছনে সাম্প্রতিক পাকিস্তানে আত্মহত্যা বোমা হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইস্লামাবাদে পাকিস্তানের সরকার জানিয়েছে যে লক্ষ্যবস্তুগুলোতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (ফিতনা আল-খাওয়ারিজ) ও তার সহযোগী গোষ্ঠী, পাশাপাশি ইসলামিক স্টেট-খোরাসান প্রদেশের সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করে যে আক্রমণগুলো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত এবং শুধুমাত্র সন্ত্রাসী ক্যাম্পকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে।
তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে হামলাগুলো নাঙ্গারহার ও পক্তিকা প্রদেশের নাগরিক এলাকায় সংঘটিত হয়েছে, যেখানে গৃহস্থালী ও ধর্মীয় বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নাঙ্গারহারে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে যে শাহাবুদ্দিন নামের এক ব্যক্তির বাড়ি আকাশ থেকে আঘাত পেয়ে প্রায় বিশজন পরিবার সদস্যের মৃত্যু ঘটেছে, যার মধ্যে নারী ও শিশু অন্তর্ভুক্ত। এই ঘটনার ফলে স্থানীয় জনগণ শোকাহত হয়ে প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে।
পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের মতে, এই আক্রমণগুলো পূর্বে অক্টোবর মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অস্থির অস্ত্রবিরতির পরেও সীমান্তে অব্যাহত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। যদিও ঐ চুক্তি সাময়িক শান্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। উভয় পক্ষই এই চুক্তি রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তান সাম্প্রতিক আত্মহত্যা বোমা হামলার সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শিয়া মসজিদে আক্রমণও অন্তর্ভুক্ত, যা রাজধানী ইস্লামাবাদের শীর্ষস্থানীয় শিয়া সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে করা হয়েছিল। একই সঙ্গে উত্তর-পশ্চিমের খ্যাবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে রমজান মাসের শুরুতে একাধিক সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়েছে, যার ফলে বহু নাগরিক আহত হয়েছে। পাকিস্তান সরকার এই ঘটনাগুলোকে তালেবানের তত্ত্বাবধানে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সরাসরি দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে।
পাকিস্তান তালেবানকে অভিযুক্ত করে যে তারা সীমানা পারাপার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এ বিষয়ে “নিশ্চিত প্রমাণ” রয়েছে যে এই হামলাগুলো আফগান নেতৃত্বের নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে। তদুপরি, পাকিস্তান সরকার দাবি করে যে এই আক্রমণগুলো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ওপর পুনরায় প্রতিশোধের অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এই যুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিতর্ক উত্থাপন করেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে পাকিস্তানের এই ধরনের সীমান্ত পারাপার বোমা হামলা পূর্বের তুলনায় আরও তীব্র হয়ে উঠেছে এবং এটি দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের প্রতিফলন। তারা সতর্ক করেন যে যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে উভয় দেশের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে এবং শরণার্থী প্রবাহে নতুন চাপ সৃষ্টি হবে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে দু’দেশের নেতাদের দ্রুত কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
সংযুক্ত জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি এ অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং উভয় পক্ষকে নাগরিক প্রাণ রক্ষার জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি যদি অবনতি হয় তবে তা কার্যকর করা কঠিন হবে।
অফিসিয়াল সূত্রের মতে, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের কূটনৈতিক মন্ত্রণালয় আগামী সপ্তাহে দু’দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার জন্য একটি বিশেষ সভা আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। এই আলোচনার মূল বিষয় হবে সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যমান অস্ত্রবিরতি চুক্তির কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা। উভয় পক্ষই এই সভাকে শান্তিপূর্ণ সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে।
অবশেষে, এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো উভয় দেশের সরকারকে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং নাগরিক ক্ষতি কমাতে তৎপরতা দেখাতে আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছে যে কোনো সামরিক পদক্ষেপের আগে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা মেনে চলা আবশ্যক। এই পরিস্থিতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর উপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই দ্রুত ও সমন্বিত কূটনৈতিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তীব্র।



