ঢাকা—রোজা শুরুর আগে থেকে নিত্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, লেবুর দাম আকাশছোঁয়া, বেগুনে আগুনের শিখা দেখা দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি বহুবার দাম বাড়ার সময় বিকল্প খাবারের রেসিপি শেয়ার করেছেন, আজও বাজারের উচ্চমূল্য নিয়ে মন্তব্যের মুখে আছেন। এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে এবং রাজনৈতিক আলোচনার নতুন দিক উন্মোচন করেছে।
বাজারে রোজা শুরুর পূর্বে লেবু, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদি মৌলিক সবজির দাম দ্রুত বাড়ছে। ঢাকার কারওয়ান বাজারে ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সময়ে লেবুর তিনটি সাইজের দামও ভিন্ন ভিন্ন, ছোট হালি লেবু ৬০ টাকায়, মাঝারি ৮০ টাকায় এবং বড় সাইজের চারটি লেবু ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গতকাল একই লেবুর দাম ১০০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে দেখা গিয়েছিল, ফলে এক দিনের মধ্যে হালি লেবুর দাম ২০ থেকে ৩০ টাকায় কমেছে।
শেখ হাসিনা পূর্বে দাম বাড়ার সময় ভোক্তাদের জন্য বিকল্প রেসিপি প্রস্তাব করেছেন। ২০১৯ সালে মাংসের দাম বেড়ে যাওয়ার পর তিনি কাঁঠালের ব্যবহার বাড়িয়ে মাংসের পরিবর্তে কাঁঠাল দিয়ে খাবার তৈরির পরামর্শ দেন, যা তাকে নেটিজেনদের মধ্যে “রেসিপি আপা” নামে পরিচিত করে তুলেছিল। একই বছর পেঁয়াজের দাম বাড়লে তিনি পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করার কথা উল্লেখ করেন এবং নিজে পেঁয়াজ ছাড়া খাবার প্রস্তুত করেন। বর্ষাকালে কাঁচা মরিচের দাম বাড়লে তিনি শুকনো মরিচের পানি ব্যবহার করে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার পদ্ধতি শেয়ার করেন। ডিমের দাম বাড়লে তিনি ডিম সেদ্ধ করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেন, যাতে ডিমের শেলফ লাইফ বাড়ে।
বেগুনের দামও সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমলেও এখনও উচ্চমাত্রায় রয়েছে। মোটা কালো লম্বা বেগুন প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, আর লম্বা কালো চিকন বেগুনের দাম ১২০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে। বেগুনের এই দুই ধরনের মধ্যে চিকন বেগুনের চাহিদা বেশি, ফলে তার দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। যদিও কিছু হ্রাস দেখা গেছে, তবে শতক টাকার উপরে বিক্রি হওয়া বেগুনের দাম ভোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
বাজারে উচ্চমূল্য নিয়ে বিরোধী দল এবং কিছু বিশ্লেষক সরকারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা করছেন। তারা যুক্তি দেন যে সরকার সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা, আমদানি শুল্ক হ্রাস এবং মৌলিক পণ্যের উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না নিলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হবে। বিরোধীরা দাবি করছেন যে নীতি প্রণয়নের দিক থেকে আরও সক্রিয় পদক্ষেপের প্রয়োজন, যাতে ভোক্তাদের উপর আর্থিক চাপ কমে।
এই সমালোচনাগুলি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষত আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতিতে। আওয়ামী লীগ (Awami League) দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে মূল মন্ত্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তবে যদি বাজারের দামের অবস্থা উন্নত না হয়, তবে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। সরকার যদি দ্রুত কার্যকরী মূল্য স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা না নিয়ে আসে, তবে বিরোধী দলগুলোর জন্য এটি ভোটার ভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পূর্বের রেসিপি পরামর্শগুলো যদিও সামাজিক মিডিয়ায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তবে বাস্তবিকভাবে ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয় কমাতে তা যথেষ্ট নয়। বাজারে মৌলিক পণ্যের দাম এখনও উচ্চ, এবং সরবরাহের ঘাটতি, লজিস্টিক সমস্যার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পণ্যের মূল্যের ওঠানামা এই পরিস্থিতি জটিল করে তুলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ব্যাপক মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা না থাকায়, ভোক্তাদের জন্য দামের ওঠানামা অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নীতি নির্ধারকরা যদি সরবরাহ শৃঙ্খল মজবুত করতে, কৃষকদের জন্য উৎপাদন সহায়তা বাড়াতে এবং বাজারে পর্যাপ্ত স্টক নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেয়, তবে দাম স্থিতিশীল হতে পারে। অন্যথায়, উচ্চমূল্য ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস করবে এবং রাজনৈতিক পরিবেশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
সারসংক্ষেপে, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রেসিপি পরামর্শগুলো পুনরায় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তবে বাজারের বাস্তবিক অবস্থা এবং বিরোধী দলের সমালোচনা সরকারকে ত্বরিত নীতি পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করতে পারে। ভবিষ্যতে মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না হলে, তা রাজনৈতিক মঞ্চে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাকে প্রভাবিত করতে পারে।



