২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উপলক্ষে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তি হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা পুনর্ব্যক্ত করে, একই সঙ্গে দেশের বহুভাষিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কেবল শব্দের জন্য লড়াই নয়; তা ছিল জনগণের গর্ব, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রথম সমষ্টিগত দাবি। বাংলা ভাষার স্বীকৃতি অর্জনের প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের গঠনে রাজনৈতিক সচেতনতার সঞ্চার ঘটায়।
আজকের দিনটি, যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ৭৫তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে, তখনও শহীদদের ত্যাগের স্মৃতি শিক্ষার ঘরে, পাঠ্যপুস্তকে এবং জাতীয় চেতনার অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। তবে দেশের ভাষা দৃশ্যপট একক ভাষা নয়; বাংলা ছাড়াও চাটগাঁইয়া, সিলেটি, রাঙ্গা, সাঁওতালি, চাকমা, মোরং, ত্রিপুরা, গারো ইত্যাদি শতাধিক আদিবাসী ও আঞ্চলিক ভাষা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার হয়।
এই ভাষাগুলো কেবল কথ্য যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তারা নদী, বন, শ্রম, অভিবাসন ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে গাঁথা জ্ঞানভাণ্ডার। উদাহরণস্বরূপ, চাকমা ভাষা নদীর প্রবাহ ও মাছ ধরার পদ্ধতি বর্ণনা করে, আর সাঁওতালি ভাষা জঙ্গলের ঔষধি গাছের নাম ও ব্যবহার সংরক্ষণ করে। এভাবে ভাষা সরাসরি সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে যুক্ত।
ভাষা সংরক্ষণকে সাংস্কৃতিক স্মৃতি রক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা মানে হল শিক্ষার মাধ্যমে বৈচিত্র্যকে সমর্থন করা। যখন কোনো ভাষা হারিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে যুক্ত জ্ঞান, ঐতিহ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি মুছে যায়, যা সমাজের সামগ্রিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
অধিকন্তু, বাংলাদেশ বর্তমানে দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুখে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থা নাগরিকের যোগাযোগ, শিক্ষার পদ্ধতি এবং জনমত গঠনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই পরিবর্তনের মধ্যে একটি ঝুঁকি রয়েছে: যদি কোনো ভাষা ডিজিটাল পরিবেশে উপস্থিত না থাকে, তবে তা বাস্তবিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তি ভাষা সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনা প্রদান করে। মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন অভিধান, স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ ও ডেটা আর্কাইভিংয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ভাষাগুলোকে রেকর্ড করা, সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিকোডে চাকমা ও সাঁওতালি লিপি যুক্ত করা, স্থানীয় ভাষায় শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় অনুবাদ সেবা চালু করা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
এ ধরনের উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করতে বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণও জরুরি। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সংলাপে বাংলা ব্যবহার বাড়াতে শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা, প্রযুক্তিগত পরিভাষা গড়ে তোলা এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা-মাধ্যমিক গবেষণা উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, ডিজিটাল নীতিতে নিশ্চিত করতে হবে যে সংখ্যালঘু ভাষাগুলোও কোডিং, ডেটা স্টোরেজ ও অনলাইন যোগাযোগে অন্তর্ভুক্ত হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এখনো অনেক স্কুলে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার সীমিত। তবে কিছু বিদ্যালয় ইতিমধ্যে দ্বিভাষিক শিক্ষা মডেল গ্রহণ করেছে; যেখানে বাংলা পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার সঙ্গে পরিচিতি বজায় রেখে জাতীয় ভাষার দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক।
ডিজিটাল ভবিষ্যতে ভাষার সমতা অর্জনের জন্য নীতি নির্ধারকদের উচিত ভাষা ডেটাবেস গঠন, ভাষা প্রযুক্তি স্টার্টআপকে আর্থিক সহায়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভাষা সংরক্ষণ প্রকল্প চালু করা। এভাবে ভাষা বৈচিত্র্যকে প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্ত করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আজকের বাংলাদেশে আরেকটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুতর সমস্যা দেখা দিচ্ছে: সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের হ্রাস। আধুনিকায়নের তালে কিছু তরুণের মধ্যে নিজের ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া দেখা যায়। এই প্রবণতা পরিবর্তন করতে হলে পরিবার ও বিদ্যালয়কে ভাষা গর্বের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: ঘরে দৈনন্দিন কথোপকথনে স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করুন, শিশুকে ঐ ভাষার গল্প, গান ও লোককথা শোনান, এবং স্কুলে ভাষা ক্লাব গঠন করে ভাষা অনুশীলনের সুযোগ দিন। এছাড়া, অনলাইন টুল ব্যবহার করে ভাষা শিখতে এবং অনুবাদ করতে উৎসাহিত করুন।
সংক্ষেপে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই উদযাপন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও শিক্ষা ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ। ভাষা সংরক্ষণ ও আধুনিকীকরণকে একসাথে এগিয়ে নিয়ে গেলে বাংলাদেশ তার বহুভাষিক ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে বিশ্বমঞ্চে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাবে।



