২২ ফেব্রুয়ারি রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑১ এর বিচারিক প্যানেলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের সেশন উদ্বোধন করা হয়েছে। মামলাটি চব্বিশের জুলাই‑আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারফিউ জারি করে ছাত্র-জনতাকে দমন ও হত্যার উসকানিসহ অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা হয়।
প্রসিকিউশন ১০ ফেব্রুয়ারি মামলার আনুষ্ঠানিক সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে, যেখানে তারা উল্লেখ করেছে যে আন্দোলন দমনের সময় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের মধ্যে ফোনালাপ হয় এবং কারফিউ জারি, মিথ্যা মামলা দায়ের এবং ছাত্র-জনতার ওপর দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এই পরিকল্পনা অনুসারে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য মোট ২৮ জন সাক্ষীর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
সাক্ষ্যগ্রহণে প্রথমে প্রসিকিউশনের প্রতিনিধিরা প্রমাণের ভিত্তি তুলে ধরবেন, যার মধ্যে ফোন রেকর্ড, মিটিং নোট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিবৃতি অন্তর্ভুক্ত। এরপর সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হক উভয়েই আদালতে উপস্থিত হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেবেন। উভয়েই তাদের গ্রেফতার পর থেকে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন।
একই ট্রাইব্যুনালে কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে নয়জন যুবককে জঙ্গি হিসেবে সাজিয়ে হত্যা করার অভিযোগে দায়ের করা মামলারও শুনানি চলবে। ঐ মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি পদক্ষেপ এবং প্রমাণের বিশ্লেষণ করা হবে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তৃত পরিসরকে তুলে ধরবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল‑২ তে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা করার অভিযোগে আরেকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান। এখানে প্রসিকিউশন আজ হাসানুল হক ইনুর সাফাইকে সাক্ষী হিসেবে জেরা করার পরিকল্পনা করেছে। ইনুর সাফাই ইতিমধ্যে আদালতে হাজির হয়েছেন এবং তার সাক্ষ্য মামলার মূল দিকগুলোকে স্পষ্ট করবে।
সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক এবং হাসানুল হক ইনুর সাফাইকে আজকের সেশনে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করা হয়েছে। তাদের উপস্থিতি মামলার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে এবং প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
মামলাটির মূল অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালের জুলাই‑আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় সরকারী কর্তৃপক্ষের দ্বারা কারফিউ জারি, মিথ্যা মামলা দায়ের এবং ছাত্র-জনতার ওপর সহিংস দমন। এই কর্মকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন উল্লেখ করেছে যে ফোনালাপের রেকর্ডে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে দমনমূলক পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেন। রেকর্ডে দেখা যায়, তারা কারফিউ জারি করার আগে ছাত্র-জনতার ওপর গৃহীত আইনগত পদক্ষেপের তালিকা প্রস্তুত করছিলেন।
আদালতের প্যানেল এই রেকর্ডগুলোকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করবে এবং উভয় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণের যথার্থতা যাচাই করবে। প্যানেল সদস্যরা প্রশ্নোত্তর সেশনের সময় উভয় পক্ষের যুক্তি শোনার পরই চূড়ান্ত রায় প্রদান করবে।
এই মামলায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশীয় পর্যবেক্ষকগণও ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করছেন। তারা আদালতের স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য পর্যবেক্ষণ দল গঠন করেছে। তবে কোনো সংস্থা সরাসরি সাক্ষ্য বা মন্তব্য প্রকাশ করেনি।
মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে প্যানেল আগামী সপ্তাহে অতিরিক্ত সাক্ষী শোনার পরিকল্পনা করেছে। এতে অতিরিক্ত ১০ জনের বেশি সাক্ষীর বিবরণ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যা মামলার প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণকে সমৃদ্ধ করবে।
মামলার ফলাফল দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ এবং মানবাধিকার নীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। তবে আদালত এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় প্রদান করেনি এবং সকল প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ শেষ হওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেবে।
এই সেশনটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়িত্বশীলদের আইনি দায়িত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। আদালতের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণই মূল লক্ষ্য।



