দিল্লি‑ঢাকা শৈলীর রাজনৈতিক ভাষা সম্প্রতি আরবি, উর্দু ও ফারসি মূলের শব্দে সমৃদ্ধ হচ্ছে, এ নিয়ে এক বিশিষ্ট বিশ্লেষক মনজুরের তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে “ইনসাফ”, “ইনকিলাব”, “ফয়সালা”, “জুলুম” ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার উদ্দেশ্যপূর্ণ কিনা, তা স্পষ্ট নয়। একই সময়ে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধে এই শব্দগুলোর ব্যবহার বাড়ার প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে এবং তাদের বাংলা সমতুল্য শব্দের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
নিবন্ধে বলা হয়েছে যে “ইনসাফ” শব্দের বাংলা সমতুল্য “ন্যায়বিচার”, “ইনকিলাব” এর পরিবর্তে “বিপ্লব”, “ফয়সালা” এর বদলে “রায়” এবং “জুলুম” এর পরিবর্তে “নির্যাতন” ব্যবহার করা যেতে পারে। একইভাবে “হিস্যা” শব্দের বদলে “অংশ”, “মোকাম” এর পরিবর্তে “স্থান” এবং “মোবারকবাদ” এর পরিবর্তে “শুভেচ্ছা” ব্যবহার করা প্রচলিত। লেখক যুক্তি দেন যে এই শব্দগুলো বাংলা ভাষায় দীর্ঘকাল থেকে বিদ্যমান, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাদের ব্যবহার বাড়ছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক বক্তৃতা, সংবাদ শিরোনাম এবং দৈনন্দিন কথোপকথনে এই শব্দগুলোর উপস্থিতি বাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক প্রশ্ন তোলেন, কেন এই শব্দগুলো হঠাৎ করে বাংলা শব্দের জায়গা দখল করছে এবং তা কি স্বাভাবিক ভাষাগত বিবর্তন নাকি কোনো আদর্শিক আক্রমণ? তিনি বলেন, শব্দের নির্বাচন ক্ষমতার ভাষা প্রকাশ করে এবং তা সমাজের ধারণা গঠনে প্রভাব ফেলে।
উল্লেখ করা হয়েছে যে উপমহাদেশে উর্দু‑আরবির প্রভাব পুরনো, তবে আধুনিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই শব্দগুলোর ব্যবহার নতুন মাত্রা লাভ করেছে। “ন্যায়” থেকে “ইনসাফ”ে রূপান্তর কেবল ধ্বনিগত পরিবর্তন নয়, বরং ন্যায়ের ব্যাখ্যা ধর্মীয় কাঠামোর দিকে ঝুঁকে যায়। একইভাবে “অংশ” থেকে “হিস্যা”তে পরিবর্তন সম্পত্তি‑অধিকার‑বণ্টনের প্রশ্নে ধর্মীয় আইনের ছায়া ফেলতে পারে।
লেখা অনুযায়ী, শব্দের ধারণা রাজনৈতিক ধারণা গড়ে তোলে এবং বিপরীতও সত্য। তাই ভাষা নির্বাচন কেবল শৈলীর বিষয় নয়, বরং নীতি‑নির্ধারণের সরঞ্জাম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, কিছু শব্দের ব্যবহার বাড়লে তা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে কাজ করতে পারে।
মনজুরের মন্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে এই শব্দগুলো বাংলা ভাষায় বহু দশক ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ব্যবহার বাড়ার কারণ হিসেবে মিডিয়ার শিরোনাম, রাজনৈতিক প্রচার এবং সামাজিক মিডিয়ার প্রভাব উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে ভাষার এই পরিবর্তন রাজনৈতিক বিতর্ককে ধর্মীয় রঙে রাঙাতে পারে, যা গণতান্ত্রিক আলোচনার স্বচ্ছতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে, শব্দের পরিবর্তন সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভাজন বাড়াতে পারে, বিশেষ করে যখন শব্দের অর্থের সূক্ষ্ম পার্থক্য সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট না থাকে।
প্রতিপক্ষের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, কিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এই শব্দগুলোকে তাদের আদর্শিক ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য ব্যবহার করে। তারা দাবি করে যে এই শব্দগুলো আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ন্যায়বিচারকে আন্তর্জাতিক মানে উপস্থাপন করে। তবে এই দৃষ্টিভঙ্গি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন হিসেবে উপস্থাপিত হয়।
ভবিষ্যতে এই প্রবণতা কীভাবে বিকশিত হবে তা এখনও অনিশ্চিত। ভাষা বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন যে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো এই শব্দগুলোকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে, তবে বাংলা ভাষার স্বতন্ত্রতা ও পরিষ্কার প্রকাশের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, ভাষা সংস্কার আন্দোলনগুলো এই প্রবণতার বিরোধিতা করে এবং বাংলা সমতুল্য শব্দের পুনঃপ্রচারে জোর দেবে।
সারসংক্ষেপে, আরবি‑উর্দু‑ফারসি শব্দের ব্যবহার বাড়ার বিষয়টি ভাষা, রাজনীতি ও সমাজের সংযোগস্থলে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। মনজুরের প্রশ্ন এবং নিবন্ধের বিশ্লেষণ উভয়ই এই প্রবণতার মূল কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাবের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ হবে ভাষা নীতি প্রণয়ন ও শিক্ষামূলক প্রচার, যাতে জনগণ শব্দের সঠিক অর্থ ও প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন হয়। একই সঙ্গে, রাজনৈতিক দলগুলোকে ভাষা ব্যবহারকে স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে। এভাবে ভাষা ও রাজনীতি দুটোই সুস্থভাবে সহাবস্থান করতে পারবে।



