শুক্রবার সন্ধ্যায় দিল্লির নয়াদিল্লি শহরে ভারত এ ও ব্রাজিলের শীর্ষ নেতারা একটি খনিজ ও ইস্পাত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দ্য সিলভার উভয় দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে চুক্তি সম্পন্ন হয়।
চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল বৈশ্বিক কাঁচামাল প্রতিযোগিতার মুখে ভারত এ‑এর বাড়তে থাকা ইস্পাত চাহিদা মেটাতে ব্রাজিলের সমৃদ্ধ খনিজ সম্পদকে ব্যবহার করা। উভয় পক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী, এই সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে উভয় দেশের ইস্পাত শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে।
ব্রাজিলের প্রতিনিধিদল উল্লেখ করেছে যে দেশটি বিশ্বের শীর্ষ লৌহ আকরিক উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি এবং ইস্পাত তৈরিতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধাতু ও খনিজের বিশাল মজুদ রয়েছে। এই সম্পদগুলোকে সরাসরি ভারত এ‑এর বাজারে প্রবেশ করিয়ে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে গভীর করা হবে।
ভারত এ‑এর ইস্পাত শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের পটভূমিতে, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ২১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন, যা বাড়তি অবকাঠামো প্রকল্প ও গৃহস্থালী চাহিদা পূরণে অপর্যাপ্ত হতে পারে। তাই ব্রাজিলের সঙ্গে সরাসরি কাঁচামাল সরবরাহ চুক্তি শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল করবে।
চুক্তির অধীনে অনুসন্ধান, খনন এবং ইস্পাত খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ আকর্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। উভয় দেশই নতুন খনি প্রকল্প, আধুনিক রপ্তানি পোর্ট ও লজিস্টিক্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে, যা কাঁচামালের পরিবহন সময় কমিয়ে ব্যয় হ্রাসে সহায়তা করবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মোদি সরকার আগামী পাঁচ বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যকে ২০ বিলিয়ন ডলারের উপরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার, যা লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বৃদ্ধির প্রয়োজন।
বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি, চুক্তিতে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সেমিকন্ডাক্টরসহ উচ্চ প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই ধরণের সমন্বয় উভয় দেশের শিল্পকে আধুনিকীকরণে ত্বরান্বিত করবে এবং রপ্তানি পণ্যের মানোন্নয়নে সহায়তা করবে।
ভারত এ ও ব্রাজিল ২০০৬ সাল থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছে। বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, কৃষি, স্বাস্থ্য, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বহু ক্ষেত্রে সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক চুক্তির বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে ব্রাজিলই ভারত এ‑এর সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক সঙ্গী। উভয় দেশই জাতিসংঘ সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং সন্ত্রাসবিরোধী উদ্যোগে সমন্বিতভাবে কাজ করে আসছে, যা বহুমাত্রিক সহযোগিতার ভিত্তি শক্তিশালী করে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই চুক্তি ভারত এ‑এর ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহের ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের খনিজ রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে তার বাণিজ্যিক উদ্বৃত্ত বাড়বে এবং বৈশ্বিক পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিতে উপকার পাবে।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা হিসেবে, উভয় দেশের সংযুক্ত লজিস্টিক্স নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল ট্রেড প্ল্যাটফর্মের উন্নয়ন বাণিজ্যিক লেনদেনের গতি বাড়াবে। তবে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, পরিবেশগত নিয়মাবলী এবং কাঁচামালের মূল্য ওঠানামা ঝুঁকি হিসেবে রয়ে যাবে, যা চুক্তির সফল বাস্তবায়নে সতর্কতা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, ভারত এ ও ব্রাজিলের নতুন খনিজ ও ইস্পাত চুক্তি উভয় দেশের শিল্প ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক পরিমাণ বাড়িয়ে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তুলবে। চুক্তির কার্যকরী ধাপগুলো দ্রুত অগ্রসর হলে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



