তেহরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শনিবার শোক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিকারের ৪০তম দিন স্মরণে সরকারবিরোধী স্লোগান উচ্চারণ করে। র্যালি অনুষ্ঠিত হয় শোকের ঐতিহ্য অনুসারে, যেখানে মৃতদের ৪০ দিন পর স্মরণ করা হয় এবং একই সঙ্গে বর্তমান বিক্ষোভের প্রতি বিরোধ প্রকাশ করা হয়। এই প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীরা তেহরানের শারিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির সামনে একত্রিত হয়ে স্লোগান শেয়ার করে, যা ইরান ইন্টারন্যাশনাল চ্যানেলের ফুটেজে ধরা পড়ে।
ফুটেজে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা “স্বৈরাচার নিপাত যাক” সহ অন্যান্য সরকারবিরোধী স্লোগান উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে, যা ইরান সরকারের প্রতি সরাসরি আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হয়। র্যালির সময় কিছু অংশে শান্তিপূর্ণ ও নীরব অবস্থান বজায় রাখার পরিকল্পনা থাকলেও, স্লোগানগুলো দ্রুতই তীব্রতর হয়ে ওঠে। এই ঘটনার প্রতিবেদন বিভিন্ন ইরান-সংক্রান্ত গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়, যা দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এই শোক র্যালি পূর্বের বড় বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা, যা ৮ ও ৯ জানুয়ারি তুঙ্গে ওঠে। ঐ দুই দিনে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সরকারবিরোধী দাবি জানায়, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপের ফলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু হয়। ইরান সরকার এই ঘটনার মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজারের বেশি বলে স্বীকার করেছে, তবে তা “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের” ফলাফল বলে যুক্তি দেয়।
শিয়াধর্মীয় শোকের প্রথা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির ৪০তম দিনকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয় এবং এই দিনটি রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার জন্য ব্যবহার করা হয়। তেহরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দিনটি স্মরণে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে শোক র্যালি পরিচালনা করে, যা পূর্বের বিক্ষোভের স্মরণ এবং বর্তমান সরকারের নীতির বিরোধিতা উভয়ই প্রকাশ করে।
শহরের কিছু প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেমন তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় ও শারিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে শোকের সাথে সাথে সরকারবিরোধী স্লোগানও উচ্চারণ করে। স্থানীয় কিছু গণমাধ্যম জানায়, র্যালির সময় শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ ও নীরব অবস্থান বজায় রাখার পরিকল্পনা করলেও, স্লোগানগুলো দ্রুতই তীব্রতর হয়ে ওঠে।
বহু মাসের আর্থিক সংকটের ফলে, গত ডিসেম্বর থেকে তেহরানে বিক্ষোভের ঢেউ শুরু হয়। দামের উত্থান, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বেকারত্বের বৃদ্ধি জনমতকে প্রভাবিত করে, এবং দ্রুতই এই অসন্তোষ দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনমূলক পদক্ষেপও তীব্র হয়।
ইরান সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর কাজকে কঠোর দমন হিসেবে উপস্থাপন করে, এবং দাবি করে যে বিক্ষোভে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যুক্ত ছিল, যারা ইরানের শত্রুদের দ্বারা উসকে দেওয়া হয়েছিল। সরকার এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি বলে স্বীকার করেছে, যদিও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই সংখ্যাকে কম বলে বিবেচনা করে।
মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ’র তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে সাত হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার বেশিরভাগই বিক্ষোভকারী। তবে সংস্থা উল্লেখ করে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ঘটনা সরকারী রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
ইরান সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিক্ষোভের মূল কারণকে “সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সরকার যুক্তি দেয় যে এই হুমকি ইরানের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করে, এবং তাই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স জানায়, শিক্ষার্থীদের মূল পরিকল্পনা ছিল শান্তিপূর্ণ ও নীরব অবস্থান বজায় রাখা, তবে স্লোগান “স্বৈরাচার নিপাত যাক” দ্রুতই শোরগোলের রূপ নেয়। এই স্লোগানটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে সরাসরি লক্ষ্য করে, যা সরকারকে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করে।
এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে ইরানের ওপর চাপ বাড়ছে। মার্কিন সরকার ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর কঠোর শর্ত আরোপের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের নিকটবর্তী এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এই আন্তর্জাতিক চাপের সঙ্গে দেশীয় বিক্ষোভের সমন্বয় ইরানের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, শোক র্যালি এবং সরকারবিরোধী স্লোগানের পুনরাবৃত্তি ইরান সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সূচনা হতে পারে। যদি নিরাপত্তা বাহিনীর দমনমূলক পদক্ষেপ বাড়ে, তবে আরও বৃহৎ প্রতিবাদ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি সংলাপের পথ খোঁজে, তবে পারমাণবিক আলোচনার পুনরায় চালু হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব হতে পারে।
শহরের রাস্তায় শিক্ষার্থীদের এই শোক র্যালি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে শোকের ঐতিহ্য এবং সরকারবিরোধী দাবি একসাথে মিশে রয়েছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রতিবাদ কীভাবে বিকশিত হবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্য হবে, তা ইরান সরকারের নীতি নির্ধারণের মূল বিষয় হয়ে থাকবে।



