মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন গতিবিধি দেখা দিয়েছে। এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনা উভয়ই সমন্বিত হয়েছে।
রায়টি মূলত ট্রাম্পের পূর্বে ঘোষিত শুল্কগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনবিরুদ্ধ বলে বিবেচনা করেছে এবং সেগুলোকে বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য দেশগুলোর ওপর আরোপিত শুল্কের সমতা বজায় থাকবে, যা বিশ্ববাজারে মূল্য স্থিতিশীলতা আনার সম্ভাবনা রাখে। তবে এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে, কারণ পূর্বে নির্ধারিত শুল্ক কাঠামো এখন অপ্রযোজ্য হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা রায়কে দু’ধরনের প্রভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। একদিকে, শুল্কের অনিশ্চয়তা রপ্তানিকারকদের পরিকল্পনা ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনা জটিল করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি পুনর্বিবেচনা করার সুযোগে বাংলাদেশি পণ্যের তুলনামূলক সুবিধা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
একজন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন, সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামো ত্যাগের বদলে, বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে এমন ক্ষেত্রগুলোতে নতুন দর-কষাকষি করা বেশি বাস্তবসম্মত। এভাবে বিদ্যমান চুক্তির পুনঃমূল্যায়ন করে ক্ষতিপূরণ বা শর্তের উন্নতি করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বাংলাদেশি অর্থনীতির জন্য সহজ নয়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে সুযোগ করে নিয়ে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক আলোচনায় কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণই সর্বোত্তম পথ।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক রায়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনার দরকারীয়তা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আদালতের রায়ের ফলে কোনো বাণিজ্য ব্যবস্থা বা শুল্ক কাঠামো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হলে তা দেশের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ফজলুল হক আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে তুলনামূলকভাবে অনুকূল শর্ত অর্জনের সুযোগ দেয়। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে দ্রুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বজায় থাকে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু রপ্তানিকারকদের বর্তমান অবস্থানকে সুবিধাজনক বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, শুল্কের অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা স্বল্পমেয়াদি চুক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা উৎপাদন পরিকল্পনা ও লজিস্টিক্সে প্রভাব ফেলবে।
মাহমুদ হাসান খান বাবু তদুপরি আশাবাদী যে, শুল্ক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবে। এ জন্য গুণগত মান উন্নয়ন ও পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান রায়ের পরিণতি হিসেবে উল্লেখ করেন, পাল্টা শুল্কের কাঠামো এখন সব দেশের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়েছে। ফলে কোনো দেশই বিশেষ সুবিধা পাবে না, এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের সমতা বজায় থাকবে।
এই রায়ের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে তার বাণিজ্য নীতি পুনর্গঠন করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন শর্তে চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে অগ্রসর হতে হবে। কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে সক্রিয় করে শুল্ক হ্রাস, পণ্যসীমা বৃদ্ধি এবং বাজার প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
দীর্ঘমেয়াদে দেখা যাবে, শুল্কের অনিশ্চয়তা কতটা স্থায়ী হয় এবং তা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবাহে কী প্রভাব ফেলে। যদি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়, তবে দেশটি তার রপ্তানি পোর্টফোলিওকে বৈচিত্র্যময় করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে রপ্তানির মার্জিন সংকুচিত করতে পারে, যা নীতি নির্ধারকদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।



