মাইকেল লিনটন, সনি পিকচার্স এন্টারটেইনমেন্টের প্রাক্তন সিইও, ২০১৪ সালের ‘দ্য ইন্টারভিউ’ ছবিটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি সম্প্রতি প্রকাশিত আত্মজীবনী থেকে জানিয়েছেন যে, ছবিটি অনুমোদনের পর সনি সাইবার হ্যাকের শিকার হয় এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পর্যন্ত ফোনে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
লিনটন তার নতুন স্মৃতিকথা “From Mistakes to Meaning: Owning Your Past So It Doesn’t Own You”‑এর একটি অংশ ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশের পর এই মন্তব্য করেন। স্মৃতিকথায় তিনি স্বীকার করেন যে, ‘দ্য ইন্টারভিউ’ অনুমোদন করা তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল।
‘দ্য ইন্টারভিউ’ একটি অন্ধকার কমেডি, যেখানে সেথ রোজেন ও জেমস ফ্রাঙ্কো উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে হাস্যকর দৃশ্য উপস্থাপন করে। ছবিটি মুক্তির আগে থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়ে।
লিনটন তখন ছবিটি অনুমোদন করেন, যদিও তার সিদ্ধান্তের পেছনে শিল্পের মধ্যে স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছা ছিল। পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করেন যে, এই তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্তটি সনি-কে বিশাল সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলেছিল।
হ্যাকের সূচনা হয় ১৭ নভেম্বর ২০১৪ তারিখে, যখন সনি-র আইটি প্রধান জানিয়ে দেন যে কোম্পানির সার্ভারের প্রায় ৭০ শতাংশ অপ্রতিস্থাপনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হ্যাকাররা সিস্টেমে প্রবেশ করে গোপন ইমেইল, স্ক্রিপ্ট এবং কর্মচারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে প্রকাশ করে।
হ্যাকের ফলে প্রকাশিত ডেটার মধ্যে চলচ্চিত্রের গোপন স্ক্রিপ্ট, অভিনেতা ও কর্মীদের ব্যক্তিগত ইমেইল অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই তথ্য ফাঁসের ফলে ‘দ্য ইন্টারভিউ’ এর মুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র আলোচনা শুরু হয়।
ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (FBI) হ্যাকের তদন্তে যুক্ত হয় এবং প্রাথমিক বিশ্লেষণে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠীকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করে। তদন্তের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে, উত্তর কোরিয়া ছবির মুক্তি রোধের জন্য এই সাইবার আক্রমণ চালিয়েছে।
ফিল্মটি মূলত ২৫ ডিসেম্বর মুক্তি পেতে নির্ধারিত ছিল, তবে হ্যাকার গোষ্ঠীর হুমকি পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান থিয়েটার চেইনগুলো ছবিটি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকে। হুমকির মধ্যে দর্শকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে এমন সতর্কতা অন্তর্ভুক্ত ছিল, ফলে ছবিটি সময়মতো বড় স্ক্রিনে না দেখিয়ে বিতরণ করা হয়।
আট মাস পর, FBI নিশ্চিত করে যে হ্যাকের পেছনে উত্তর কোরিয়া ছিল। এই সিদ্ধান্তের পর সনি-র সঙ্গে বহু শিল্পী ও প্রযোজকের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে উইল স্মিথ, আদাম স্যান্ডলার এবং অ্যাঞ্জেলিনা জোলির সঙ্গে পূর্বে গড়ে তোলা অংশীদারিত্বে বড় ধাক্কা লাগে।
সেই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা লিনটনকে ফোনে জিজ্ঞাসা করেন, “একজন শত্রু দেশের নেতার হত্যাকে গল্পের মূল বিষয় বানানোর সময় আপনার মাথায় কী ছিল?” ওবামা এই সিদ্ধান্তকে ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন।
লিনটন এখন স্বীকার করেন যে, ছবিটি অনুমোদনের তার সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো এবং অপ্রয়োজনীয় ছিল। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি ছিল শিল্পের মধ্যে নিজেকে প্রমাণ করার ইচ্ছা, যা শেষ পর্যন্ত সনি-কে বড় ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে লিনটন শিখেছেন যে, কোনো প্রকল্পের অনুমোদনকে দ্রুত সিদ্ধান্তে না নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা দরকার। তিনি ভবিষ্যতে এমন ভুল পুনরাবৃত্তি না করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং শিল্পের অন্যান্য নেতাদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে এই ঘটনাকে তুলে ধরেছেন।



