জাতীয় নাগরিক দলের চিফ হুইপ ও আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ২১ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতে ফেসবুকে একটি পোস্টে উল্লেখ করেন যে, এককেন্দ্রিক ও সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলা ভাষার সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন সীমাবদ্ধ রেখেছে। তিনি এই মন্তব্যের মাধ্যমে ভাষা নীতি ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত শেয়ার হয়ে রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক গোষ্ঠীর মধ্যে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
নাহিদের মতে, বাংলা ভাষা দেশের আত্মপরিচয় এবং জাতীয় সংগ্রামের প্রতীক হলেও, এককেন্দ্রিক ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ভাষার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বাংলা ভাষা আমাদের আত্মপরিচয় এবং জাতীয় সংগ্রামের প্রতীক, তবে এককেন্দ্রিক, সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলার সম্ভাবনাকে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত করেছে।” এই বক্তব্যে তিনি বর্তমান ভাষা নীতির প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন।
নাহিদ উল্লেখ করেন যে, বাংলা কখনো একরৈখিক ভাষা ছিল না; বরং এটি সর্বদা সমন্বয়, সংলাপ এবং সভ্যতা নির্মাণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। তিনি ভাষার বহুমুখী প্রকৃতিকে তুলে ধরে বলেন, “বাংলা সব সময় সমন্বয়, সংলাপ এবং সভ্যতা নির্মাণের ভাষা।” এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ভাষার ঐতিহাসিক বিকাশে বহুসংস্কৃতির ভূমিকা উল্লেখ করেন।
বাংলা ভাষার প্রকৃত ঐতিহ্যকে তিনি বৈচিত্র্যকে ধারণ করা এবং বহুত্বকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হিসেবে বর্ণনা করেন। নাহিদের মতে, ভাষা যখন বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার সঙ্গে সংলাপ করে তখনই তা শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হয়। তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ভাষা নীতি গঠনে অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
নাহিদের মতে, বাংলা তখনই প্রকৃত অর্থে বিকশিত হবে, যখন দেশে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে। তিনি উল্লেখ করেন, “বাংলা তখনই প্রকৃত অর্থে বিকশিত হবে, যখন দেশে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে।” এই বক্তব্যে তিনি ভাষা ও সংস্কৃতির পারস্পরিক সংযোগের গুরুত্বকে পুনরায় জোর দেন।
তিনি আরও বলেন, যে ভাষা নিজেকে সীমাবদ্ধ করে এবং অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে কোনো সংযোগ রাখে না, সেই ভাষা সময়ের সঙ্গে দুর্বল হয়ে যায়। অন্যদিকে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অন্য ভাষার সঙ্গে সংলাপে আসা ভাষা সব সময় শক্তিশালী ও জীবন্ত থাকে। এই তুলনা তার ভাষা নীতির দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে।
নাহিদ পোস্টে আরবি, ফারসি, উর্দু, সংস্কৃত, পালি ও ইংরেজি সহ বিভিন্ন জনজাতির ভাষাকে বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “চাকমা, মারমা সহ বিভিন্ন জনজাতির ভাষাও বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ।” এই তালিকায় তিনি ভাষা সংমিশ্রণের মাধ্যমে বাংলার সমৃদ্ধি তুলে ধরেছেন।
চর্যাপদের পালি‑বৌদ্ধ ঐতিহ্য, বৈষ্ণব পদাবলি সংস্কৃতির গভীর রস, আরবি‑ফারসি শব্দভান্ডার, সুফি সাহিত্য এবং উপনিবেশ‑পরবর্তী ইংরেজি জ্ঞানতন্ত্রের সংযোজনকে তিনি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মূল স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এই সব উপাদান মিলিয়ে বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।” এভাবে তিনি ভাষার বহুমাত্রিক গঠনকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন।
সিলেটী ও চাঁটগাইয়ার মতো আঞ্চলিক ভাষার রূপগুলোকেও তিনি সম্ভাবনার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। নাহিদের মতে, এই আঞ্চলিক রূপগুলো বাংলা ভাষার বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে এবং জাতীয় পরিচয়ের বহুমুখী দিককে প্রকাশ করে। তিনি এই রূপগুলোর সংরক্ষণ ও উন্নয়নের পক্ষে সুর তুলে ধরেন।
নাহিদ ইসলাম চারটি করণীয় তুলে ধরেন: প্রথমত, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার পূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, প্রতিটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার মর্যাদা সংরক্ষণ; তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক জ্ঞান অর্জনের জন্য বিদেশি ভাষায় দক্ষতা তৈরি; চতুর্থত, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও আঞ্চলিক ভাষা‑সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখা। তিনি বলেন, “এই চারটি পদক্ষেপ বাংলার ভবিষ্যৎ গঠনে অপরিহার্য।” এই পরিকল্পনা ভাষা নীতি ও শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি হতে পারে।
শেষে নাহিদ লিখেছেন, বাংলাদেশ এমন এক বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক দেশ হবে, যেখানে বৈচিত্র্য, সংলাপ এবং ঐতিহ্য‑আধুনিকতার মিলনই জাতির মূল শক্তি হয়ে উঠবে। তিনি ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের স্বপ্ন প্রকাশ করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি নীতি গঠনে নতুন আলোচনার সূচনা করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, নাহিদের এই মন্তব্য জাতীয় ভাষা নীতি নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি যে বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, তা প্রধানধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ঐতিহ্যবাহী একতাবাদী রেটোরিকের সঙ্গে পার্থক্য সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতে এই আলোচনার ফলে ভাষা শিক্ষা, মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।



