ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের তৃতীয় বর্ষের রসায়ন ছাত্র নুরুল্লাহ শাওনের হিংসাত্মক মৃত্যু নিয়ে পুলিশ ছয়জন সন্দেহভাজীকে গ্রেপ্তার করেছে। শাওন এবং তার বন্ধু রিয়াদ ২০২৬ সালের বুধবার বিকালে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে ঘুরে বেড়ানোর সময় ছিনতাইকারী গোষ্ঠীর আক্রমণের শিকার হন। রিয়াদ পালিয়ে যাওয়ার পর শাওন নিখোঁজ হয়ে যান এবং দুই দিন পর শুক্রবার রাত প্রায় ১০টায় জয়নুল আবেদিন উদ্যানের সংলগ্ন নদ থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
শাওনের পরিবার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার চর জাকালিয়া গ্রামে বসবাস করে। শাওনের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর আনন্দ মোহন কলেজের মাঠে শোকসভা ও শেষিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। শেষিক্রিয়ার পর কয়েকশো শিক্ষার্থী ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ মিছিল চালায়, যেখানে তারা প্রশাসনের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে এবং ছয়জন সন্দেহভাজীর গ্রেপ্তার না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
শিক্ষার্থীদের এই দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ময়মনসিংহ‑৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ উপস্থিত হন। তিনি শহরে বাড়তে থাকা চুরি ও ছিনতাইয়ের সমস্যাকে গৃহীত না করা যায় এমনভাবে বর্ণনা করে প্রশাসনের অবহেলাকে সমালোচনা করেন এবং সন্ধ্যা ৮টার মধ্যে সন্দেহভাজীদের গ্রেপ্তার না হলে পুলিশের বিরুদ্ধেই পদক্ষেপ নেওয়ার সতর্কতা দেন।
অধিকাংশ পুলিশ কর্মী রাত ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে শেষ পর্যন্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। গ্রেপ্তারের নাম হল বিশাল বিন, বিপুল বিন, রাজ বিন, হৃদয়, দেবরাজ বিন এবং মুন্না বিন। তাদের সবেরই বাড়ি ময়মনসিংহের কোতোয়ালি থানার চর জেলখানা এলাকার বিনপাড়ায় অবস্থিত।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, শাওনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজীদের শনাক্ত করতে পুলিশ দশটি দল গঠন করে ব্যাপক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, “আসামিদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। বাকি সন্দেহভাজীদের ধরার কাজ অব্যাহত রয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের দাবি এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি।”
শাওনের দেহ উদ্ধার হওয়ার পর শহীদ মিনারে ফুল রাখার জন্য আসা সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি শিক্ষার্থীরা টাউন হল মোড়ে আটকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিবাদ চালায়। এই প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের প্রতি তাদের হতাশা ও শোক প্রকাশ করে, পাশাপাশি শোশিতের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করে।
পুলিশের মতে, শাওনের হত্যায় জড়িত ছিনতাইকারী গোষ্ঠী পূর্বে একই এলাকায় অনুরূপ অপরাধে জড়িত ছিল। বর্তমানে তদন্তকারী দল শাওনের মৃত্যুর কারণ, অপরাধের পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিদের সনাক্তকরণে মনোনিবেশ করেছে। সন্দেহভাজীদের গ্রেফতার এবং তাদের বাড়ি অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত প্রমাণগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
শাওনের পরিবার এবং শিক্ষার্থীরা এখনো শোকমুডে রয়েছে। তারা ন্যায়বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার এবং অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে চলেছে। ময়মনসিংহের স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই দাবি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সময়ে সময়ে তথ্য প্রদান করবে।
শাওনের মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত অপরাধের পরিসর এবং সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কার্যক্রমের ব্যাপকতা এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। তবে পুলিশ ইতিমধ্যে দশটি অনুসন্ধান দল গঠন করে, সন্দেহভাজীদের গ্রেফতার এবং অতিরিক্ত অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আদালতে মামলার শোনানির সময় সন্দেহভাজীদের বিরুদ্ধে প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে এবং শোশিতের পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এই ঘটনার পর ময়মনসিংহে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসন অতিরিক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করেছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শহরে অপরাধের হার কমাতে বিভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। শাওনের পরিবার এবং শিক্ষার্থীরা এই পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে ন্যায়বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের শোক ও উদ্বেগ অব্যাহত থাকবে।



