ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত জেনেভা শিবিরে উর্দু ভাষাভাষী তরুণদের মধ্যে লিখিত উর্দুতে পারদর্শিতা হ্রাসের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। শিবিরের ঘিঞ্জি গলিতে বসে থাকা ষাটোর্ধ্ব নাসিমা খাতুন তার নাতি আরমানকে উর্দু ভাষার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের ভাষা শেষ হয়ে যাবে, এরা না উর্দু বলতে পারে, না ঠিকভাবে লিখতে পারে”।
নাসিমা নিজে শুদ্ধ উর্দুতে কথা বলতে পারেন, তবে আরমানের মতো পঞ্চম শ্রেণি শিক্ষার্থী উর্দু ও বাংলা মিশিয়ে কথা বলে। নাতির উত্তর শুনে নাসিমার মুখে স্পষ্ট হতাশা দেখা যায়, যা শিবিরের ভাষা সংরক্ষণ সমস্যার প্রতিফলন।
প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা মাস হিসেবে পালিত হয়, যেখানে ইউনেস্কো ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপিত হয়। যদিও এই দিনটি সব ভাষার সমান অধিকারকে তুলে ধরে, বাস্তবে উর্দু ভাষাভাষীদের জন্য সমান সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে না।
বাংলাদেশে বেসরকারি সংস্থা কাউন্সিল অফ মাইনরিটিস (সিওএম) উর্দু ভাষাভাষী বিহারী সম্প্রদায়ের আইনি সহায়তা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১১৬টি শিবিরে প্রায় চার লক্ষ বিহারী উর্দু ভাষাভাষী বসবাস করে।
২০০৮ সালে হাইকোর্টের রায়ে উর্দু ভাষাভাষীদের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়, ফলে তারা জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটাধিকার পায়। তবে এই আইনি স্বীকৃতি তাদের ভাষাগত সংকট সমাধান করতে পারেনি; শিবিরের বেশিরভাগ বাসিন্দা কথা বলতে পারে, কিন্তু লিখতে‑পড়তে পারে না।
শিবিরের বয়স্কদের মধ্যে উর্দু পড়া‑লেখা এখনও চালু আছে, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তা প্রায় অদৃশ্য হয়ে আসছে। অভ্যাসের অভাবে তারা উর্দু লিপি চিনতে পারে না, ফলে ভাষা ব্যবহার সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
শিবিরের শিশুরা সরকারি বিদ্যালয়ে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করে, যেখানে উর্দু শেখার কোনো সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ নেই। ফলে তারা উর্দুতে সঠিকভাবে পড়া‑লেখা শিখতে পারে না, শুধুমাত্র পারিবারিক পরিবেশে সীমিত জ্ঞানই থাকে।
কিছু পরিবার ব্যক্তিগতভাবে উর্দু শেখার চেষ্টা করে, তবে তা সীমিত ও অনিয়মিত থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠিত পাঠ্যক্রম বা প্রশিক্ষক না থাকায় শিক্ষার মান বজায় রাখা কঠিন।
জেনেভা শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, উর্দু শিখতে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠান বা স্কুলে উর্দু বিষয় না থাকায় তারা আত্মহত্যার পথে। তিনি বলেন, “মাতৃভাষা এখন বিলুপ্তির পথে”।
অন্য এক বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীমেরও একই অভিজ্ঞতা। তিনি এক সময় উর্দু পড়তে পারতেন, কিন্তু নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ না থাকায় এখন তা ভুলে গেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, যারা এখনও উর্দুতে পারদর্শী, তাদের সংখ্যা দিন দিন কমছে।
কাউন্সিল অফ মাইনরিটিসের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট খালিদ হোসেনের মতে, উর্দু ভাষার সংরক্ষণে সরকারি নীতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি জোর দেন, উর্দু শিক্ষার জন্য বিশেষ কোর্স ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ চালু করা উচিত।
শিবিরের তরুণদের জন্য উর্দু ভাষা পুনরুজ্জীবিত করার কিছু ব্যবহারিক উপায় আছে। পরিবারে দৈনন্দিন কথোপকথনে উর্দু ব্যবহার বাড়ানো, উর্দু বই ও পত্রিকা শেয়ার করা, এবং অনলাইন উর্দু শিক্ষার প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ করা কার্যকর হতে পারে।
আপনার শিবিরে বা আশেপাশে উর্দু ভাষা সংরক্ষণে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে চিন্তা করুন এবং আপনার মতামত শেয়ার করুন।



