মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ৯ ফেব্রুয়ারি জারি করা ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ অনুযায়ী, একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নতুন শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলে পুনর্ভর্তি ফি আর নেওয়া যাবে না। নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, টিউশন ফি, ভর্তি ফি, সেশন ফি এবং বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষার ফি সহ অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।
নতুন নির্দেশিকায় ২০২৪ সালের টিউশন ফি নীতিমালা অনুসারে নির্ধারিত বেতন গ্রহণের অনুমতি রয়েছে, তবে পুনর্ভর্তি ফি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। এই নীতিমালা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সকল বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বাধ্যতামূলক, এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের স্বাক্ষরে প্রকাশিত হয়েছে।
পূর্বে, গত বছরের ১৯ নভেম্বরও একই ধরনের নির্দেশনা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল যে, এক শ্রেণি থেকে অন্য শ্রেণিতে অগ্রসর হলে পুনর্ভর্তি ফি না নেওয়া হবে, কেবল সেশন চার্জ নেওয়া যাবে। তবে বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠান এই নিয়ম মেনে চলেনি, ফলে অভিভাবকরা অতিরিক্ত আর্থিক বোঝার মুখোমুখি হচ্ছিলেন।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সম্পর্কে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৪ সালের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে উল্লেখ আছে যে, প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় ২২ লাখ ৭৪ হাজার ৪৪৮ শিক্ষার্থী রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে পুনর্ভর্তি ফি নিয়ে অভিযোগের পরিমাণও যথেষ্ট, যা নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
একটি বাস্তব উদাহরণে দেখা যায়, ঢাকা শহরের একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণি শেষ করে এক শিক্ষার্থী যখন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতে চায়, তখন বিদ্যালয়টি পুনর্ভর্তি ফি হিসেবে প্রায় ১৫,০০০ টাকা ধার্য করে। অভিভাবকরা এই অতিরিক্ত চার্জকে অযৌক্তিক বলে অভিযোগ করেন এবং আদালতে রিট আবেদন দায়ের করেন। নতুন নীতিমালা এই ধরনের অনধিকৃত ফি আরোপকে রোধের লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
নতুন নীতিমালার অধীনে, বিদ্যালয়গুলোকে তাদের আর্থিক কাঠামো প্রকাশ করতে হবে, যাতে টিউশন ফি, ভর্তি ফি, সেশন ফি এবং পরীক্ষার ফি ইত্যাদি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। এছাড়া, শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হলে তা ন্যায্যতা প্রমাণ করতে হবে। এই ব্যবস্থা শিক্ষার্থীর আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং অভিভাবকদের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা সহজ করবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকে নীতিমালার প্রয়োগের জন্য অভ্যন্তরীণ নীতি তৈরি করে তা প্রকাশ করতে হবে। তদুপরি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
এই নীতিমালার কার্যকরী হওয়ার ফলে, পুনর্ভর্তি ফি সংক্রান্ত আর্থিক চাপ থেকে মুক্তি পাবে লক্ষ লক্ষ পরিবার। তবে, অভিভাবকদের জন্য এখনও কিছু বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। উদাহরণস্বরূপ, সেশন ফি কতটুকু হতে পারে এবং তা কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা স্পষ্ট না হলে নতুন আর্থিক বোঝা সৃষ্টি হতে পারে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় বিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত সকল আর্থিক নথি ভালোভাবে যাচাই করুন, এবং যদি পুনর্ভর্তি ফি দাবি করা হয় তবে তা নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে জানিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করুন। এছাড়া, টিউশন ফি এবং সেশন ফি সংক্রান্ত তথ্য লিখিতভাবে সংগ্রহ করে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ এড়ানো সম্ভব।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং পুনর্ভর্তি ফি নিষিদ্ধ করা শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে, শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষায় একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা বাড়বে।



