শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মোংলা বন্দর পরিদর্শন করে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের কথা জানিয়ে দেন। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, কোনো চুক্তি যদি দেশের স্বার্থ, বাণিজ্য, অর্থনীতি বা সার্বভৌমত্বকে ক্ষতি করে, তবে তা বাতিল করা হবে।
মন্ত্রীয় সফরের সময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিদেশের সঙ্গে চুক্তি করা স্বাভাবিক, তবে তা দেশের উপকারে আসা জরুরি। চুক্তি রক্ষা করা হোক বা বাতিল করা হোক, সব প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
মন্ত্রী এই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকা প্রক্রিয়ার সূচনা ইতিমধ্যে হয়েছে, তা তিনি জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চুক্তি রদ করার ক্ষেত্রে দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক চুক্তি রক্ষার নিয়ম মেনে চলা হবে, যাতে কোনো আইনি জটিলতা না দেখা দেয়।
মোংলা বন্দর সম্পর্কে মন্ত্রী মন্তব্যে বলেন, বন্দরটির অবকাঠামো ও সক্ষমতা যথেষ্ট, তবে তা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ভবিষ্যতে বন্দরটির সম্ভাবনা সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যিক লেনদেন বাড়ানো এবং দেশের রপ্তানি-আমদানি উন্নত করা হবে।
পরিদর্শনের সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নুরুন্নাহার চৌধুরী, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী প্রথমে বন্দরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বন্দর পরিচালনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং চুক্তি পর্যালোচনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আলোচনা করেন।
মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলোতে রেল, সড়ক, শিপিং ও কাস্টমস সংক্রান্ত ধারাগুলো অন্তর্ভুক্ত। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, এই ধারাগুলো যদি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রাখে, তবে সংশোধন বা বাতিলের প্রস্তাবনা দেওয়া হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চুক্তি রদ করার সিদ্ধান্তে কোনো একপক্ষীয় চাপ নয়, বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিবেচনা করা হবে।
এই ঘোষণার পর বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, চুক্তি পর্যালোচনা প্রক্রিয়া বাংলাদেশ সরকার এবং ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের নতুন পর্যায়ের সূচনা হতে পারে। যদি চুক্তি পুনরায় আলোচনা হয়, তবে উভয় দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কাঠামোতে পরিবর্তন আসতে পারে, যা রপ্তানি-আমদানি প্রবাহ, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিতে প্রভাব ফেলবে।
মন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, চুক্তি রদ বা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারকে প্রক্রিয়ার তথ্য সরবরাহ করা হবে। তিনি উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মোংলা বন্দরকে সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানোর জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং আধুনিকীকরণ পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করা হবে। মন্ত্রী আশ্বাস দেন, ভবিষ্যতে বন্দরটি দেশের প্রধান বহুজাতিক বাণিজ্যিক হাব হিসেবে কাজ করবে এবং আঞ্চলিক শিপিং রুটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই ঘোষণার পর সরকারী সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, চুক্তি পর্যালোচনা প্রক্রিয়া দ্রুততর করার জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। টাস্কফোর্সের সদস্যদের মধ্যে আইন বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ এবং কূটনৈতিক বিশারদ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে চুক্তির সকল দিক যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা যায়।
মোংলা বন্দর পরিদর্শনের সময় মন্ত্রী এবং উপস্থিত কর্মকর্তারা বন্দর পরিচালনা সংক্রান্ত সমস্যাগুলো, যেমন লোডিং-আনলোডিং সুবিধার ঘাটতি, সেবা মানের উন্নতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক চ্যালেঞ্জগুলোও আলোচনা করেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বন্দর কার্যক্রমে পরিবেশগত মানদণ্ডের প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সারসংক্ষেপে, নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের এই ঘোষণায় স্পষ্ট হয়েছে যে, ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলো দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে এবং বন্দর উন্নয়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সর্বোচ্চ করা হবে। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপগুলো দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক প্রবাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে।



