গ্লোবালাইজেশনের ফলে তথ্য ও সুযোগের প্রবেশাধিকার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এই পরিবেশে একাধিক ভাষা ব্যবহারকারী তরুণদের জন্য “প্রাধান্যশীল ভাষা”র চাপ বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী শিক্ষার্থীরা এখন মাতৃভাষা, জাতীয় ভাষা এবং আন্তর্জাতিক ভাষা একসাথে শিখতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই পরিস্থিতি কীভাবে গঠিত হচ্ছে এবং এর প্রভাব কী, তা আজকের আলোচনার মূল বিষয়।
অধিকাংশ অভিভাবক তাদের সন্তানকে ইংরেজি বা বাংলায় দক্ষ করতে চান, কারণ তারা বিশ্বাস করেন যে এই ভাষাগুলো ভবিষ্যতে ভাল শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দরজা খুলবে। তবে এই ধারণা সবসময় বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; অনেক পরিবারে শিশুরা এমন ভাষায় পড়াশোনা করে না যা তারা সবচেয়ে স্বাভাবিকভাবে বুঝতে পারে।
বিশ্বব্যাপী প্রায় চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী এমন ভাষায় শিক্ষা পায় না যা তাদের মাতৃভাষা, ফলে তারা শিখনের মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এই সংখ্যা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও সতর্কতামূলক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়, যেখানে বহু ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই মাতৃভাষা বাদ দিয়ে অন্য ভাষায়ই পড়াশোনা করতে বাধ্য হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রথমে মাতৃভাষায় শিক্ষা শুরু করে ধীরে ধীরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাষা যুক্ত করলে শিক্ষার্থীর জ্ঞানীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এই পদ্ধতি ভাষা দক্ষতা হ্রাস করে না, বরং নতুন ভাষা শিখতে সহায়তা করে।
শৈশবের প্রথম বছর থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত মস্তিষ্ক ভাষা শোষণের সর্বোচ্চ সময়ে থাকে; এই সময়ে শিশুরা সহজে নতুন শব্দ ও গঠন শিখে। তাই মাতৃভাষা ভিত্তিক শিক্ষা মস্তিষ্কের নিউরাল নেটওয়ার্ক গঠনে সহায়ক এবং পরবর্তীতে জ্ঞানীয় বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে দেখা যায় যে বহু ভাষা জানার ফলে নির্বাহী কার্যক্রম, স্মৃতি, নমনীয়তা এবং সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা শক্তিশালী হয়। এই সুবিধা শুধুমাত্র একক ভাষা শিক্ষার তুলনায় বেশি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
ভাষা কেবল অর্থনৈতিক সুবিধা নয়, এটি ব্যক্তিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সংহতির মূল ভিত্তি। মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় ও জাতীয় পরিচয় গড়ে ওঠে, যা দেশের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধিতে অবদান রাখে।
বহু ভাষা জানলে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ে, যা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে এবং নতুন উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে সহায়ক। এ ধরনের আন্তঃসাংস্কৃতিক সংযোগের ফলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
ইউনেস্কোর মতে, বহুভাষিক শিক্ষা অন্তত তিনটি ভাষা ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করে: প্রথমে মাতৃভাষা, তারপর আঞ্চলিক বা জাতীয় ভাষা, এবং শেষে আন্তর্জাতিক ভাষা। এই কাঠামো শিক্ষার্থীর ভাষা দক্ষতা সমন্বিতভাবে বিকাশের লক্ষ্য রাখে।
বাংলাদেশের বাস্তব উদাহরণে দেখা যায়, সিলেটের গ্রামীণ এলাকায় শিশুরা প্রথমে সিলেটি ভাষায় শিখে, পরে বাংলা এবং শেষে ইংরেজি শেখে। অন্যদিকে ঢাকা শহরের কিছু পরিবারে শিশুরা বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দি বা চীনা ভাষা একসাথে শিখে, যা তাদের বহুমাত্রিক যোগাযোগের দক্ষতা বাড়ায়।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য কার্যকরী উপায় হল বাড়িতে মাতৃভাষা ব্যবহারকে উৎসাহিত করা, স্থানীয় গল্পের বই ও অডিও উপকরণ ব্যবহার করা এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক ভাষা ক্লাসে অংশগ্রহণ করা। এভাবে শিশুরা স্বাভাবিকভাবে মাতৃভাষা বজায় রেখে অন্যান্য ভাষা শিখতে পারে।
আপনার সন্তান বা শিক্ষার্থীর ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনা কীভাবে গঠন করবেন? মাতৃভাষার গুরুত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে, ধীরে ধীরে অন্য ভাষা যুক্ত করলে কি তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বাড়বে?



