গত মঙ্গলবার ঝাড়খণ্ডের দূরবর্তী আদিবাসী গ্রাম কুদসাইতে ডাইনি সন্দেহে এক নারী ও তার দশ বছর বয়সী পুত্রকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলে পুলিশ তৎক্ষণাৎ হস্তক্ষেপ করে এবং চারজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে।
হত্যার শিকার নারীর স্বামীও একই হামলায় গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় আহত হন এবং বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ জানায়, অপরাধে জড়িত অন্য সন্দেহভাজনদের ধরতে তল্লাশি চালু রয়েছে, তবে গ্রেপ্তারদের এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।
জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ডাইনি সন্দেহে ভারতবর্ষে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই নারী। এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাম্প্রতিক কুদসাই ঘটনার তুলনা করলে, ডাইনি অভিযোগে হিংসা এখনও গ্রামীণ ও আদিবাসী এলাকায় প্রচলিত রয়েছে।
গত মঙ্গলবারের একই দিনে জ্যোতি সিনকু ও তার সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়, আর কয়েক মাস আগে প্রতিবেশী বিহার রাজ্যে একই ধরনের অভিযোগে এক পরিবারের পাঁচ সদস্যকে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে কুসংস্কার ও দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গ্রামাঞ্চলে অপরাধের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কুদসাই গ্রাম রাঁচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সেখানে মাত্র পঞ্চাশটি মাটির ঘর রয়েছে। সম্প্রতি গ্রামে কয়েকটি গবাদি পশুর মৃত্যু এবং পুসতুন বিরুয়া নামের এক ব্যক্তির অস্বাভাবিক অসুস্থতা ও মৃত্যুর পর জাদুটোনার গুজব ছড়িয়ে পড়ে।
পুসতুনের অসুস্থতা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীরা জ্যোতি সিনকুকে ডাইনিবিদ্যা চর্চার অভিযোগে সন্দেহ করতে থাকে। পুসতুনের মৃত্যু হলে, উত্তেজিত একটি গোষ্ঠী তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে জ্যোতি ও তার পরিবারের সদস্যদের ওপর আগুন লাগায়।
দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি কোলহান সিনকু জানান, ওই রাতে অন্তত ডজনখানেক লোক তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে, যার মধ্যে পাঁচজন নারীও ছিলেন। হামলাকারীরা তার স্ত্রী ও সন্তানকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়, আর তিনি নিজেও দগ্ধ হয়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।
কোলহান সিনকু গ্রামসভায় বিষয়টি মীমাংসা করার অনুরোধ করেন, তবে তিনি জানান যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই অগ্রাহ্যতা গ্রামবাসীর মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা হ্রাস করেছে।
পুসতুনের স্ত্রী জানিয়ে দেন, তার স্বামী বারবার অজ্ঞান হয়ে যেত এবং তারা স্থানীয় এক হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে পরামর্শ নেয়। চিকিৎসক বলেছিলেন পুসতুনের কোনো শারীরিক রোগ নেই এবং হাসপাতালে না নেওয়ার কারণ ছিল আর্থিক দুরবস্থা ও দূরত্ব।
পুলিশের মতে, গ্রেফতারকৃত চারজন সন্দেহভাজন বর্তমানে হেফাজতে রয়েছে এবং তদন্ত চলমান। তারা ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ, সাক্ষী বিবৃতি এবং মৃতদেহের ফরেনসিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে অপরাধের সম্পূর্ণ চিত্র উন্মোচন করার চেষ্টা করছে।
ডাইনি অভিযোগে গৃহহিংসা ও হত্যাকাণ্ড ভারতীয় দণ্ডসংহিতা অনুযায়ী কঠোর শাস্তির আওতায় পড়ে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য সচেতনতা কর্মসূচি চালু করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অধিক তদন্তের পর যদি অতিরিক্ত সন্দেহভাজন শনাক্ত হয়, পুলিশ দ্রুত গ্রেফতার করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে। একই সঙ্গে, স্থানীয় প্রশাসনকে আদিবাসী জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডাইনি অভিযোগে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বিপদ পুনরায় স্পষ্ট হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণই ভবিষ্যতে অনুরূপ হিংসা রোধের মূল চাবিকাঠি হবে।



