মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা আগামী ৬ মার্চ ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আর্টেমিস‑২ মিশনের উৎক্ষেপণ নির্ধারণ করেছে। এই মিশনটি মানবজাতিকে পাঁচ দশক পর আবার চাঁদের কক্ষপথে পাঠাবে এবং আর্টেমিস প্রোগ্রামের মূল ধাপ হিসেবে কাজ করবে।
আর্টেমিস প্রোগ্রামটি চাঁদে স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত একটি সিরিজ মিশন নিয়ে গঠিত। আর্টেমিস‑১ সফলভাবে অর্কিটিক টেস্ট ফ্লাইট সম্পন্ন করার পর, আর্টেমিস‑২ প্রথম মানববাহী মিশন হিসেবে পরিকল্পিত, যা ভবিষ্যৎ মঙ্গল মিশনের জন্য প্রযুক্তিগত ভিত্তি স্থাপন করবে।
১৯৭২ সালের অ্যাপোলো‑১৭ মিশনের পর চাঁদের কক্ষপথে মানুষের শেষ যাত্রা ছিল, আর এখন নাসা আর্টেমিস প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তি করতে চাচ্ছে। লক্ষ্য হল চাঁদের চারপাশে নিরাপদে ঘুরে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং নতুন কক্ষপথের সম্ভাবনা যাচাই করা।
উদ্যোগের জন্য বিশাল ক্ষমতার স্পেস লঞ্চ ভেহিকল ব্যবহার করা হবে, যা কেনেডি স্পেস সেন্টারের প্যাড থেকে উৎক্ষেপণ হবে। রকেটের প্রথম স্তরে প্রায় সাত লাখ গ্যালন তরল জ্বালানি লোড করা হবে, যা উৎক্ষেপণের প্রয়োজনীয় তাগিদ সরবরাহ করবে। এই প্রস্তুতি মিশনের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছে।
মিশনে চারজন অভিজ্ঞ মহাকাশচারী অংশ নেবেন: রিড উইসম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। তারা প্রায় দশ দিনের দীর্ঘ যাত্রায় পৃথিবীকে একবার পার হবে, তারপর চাঁদের চারপাশে একাধিক কক্ষপথ সম্পন্ন করবে। প্রত্যেকের নিজস্ব পেশাগত পটভূমি মিশনের বৈচিত্র্য বাড়াবে।
অরিয়ন ক্যাপসুল চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করার জন্য নকশা করা হয়নি, তাই এই মিশনে ল্যান্ডিং না করে কক্ষপথে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। মহাকাশচারীরা ‘ফিগার‑ইট’ নামে পরিচিত কক্ষপথ অনুসরণ করবে, যা চাঁদের দু’পাশে বিস্তৃত হবে এবং পৃথিবীর তুলনায় ভিন্ন গতিবেগে চলবে।
এই কক্ষপথের মাধ্যমে তারা অ্যাপোলো‑১৩ মিশনের রেকর্ডকৃত দূরত্ব অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মানব ইতিহাসে সর্বোচ্চ চাঁদ‑সাপেক্ষে ভ্রমণ হবে। রেকর্ড ভাঙলে ভবিষ্যৎ মঙ্গল মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, বিশেষ করে দীর্ঘ দূরত্বের নেভিগেশন ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে।
গত বৃহস্পতিবার নাসা সফলভাবে ‘ওয়েট ড্রেস রিহার্সাল’ সম্পন্ন করেছে, যেখানে রকেটের ট্যাঙ্কে সাত লাখ গ্যালনেরও বেশি তরল জ্বালানি পূর্ণ করা হয়। এই পরীক্ষা উৎক্ষেপণের পূর্বে সিস্টেমের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে করা হয় এবং ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য বাস্তবিক ডেটা সরবরাহ করে।
প্রথম মহড়ায় হাইড্রোজেন লিকের সমস্যা দেখা গিয়েছিল, তবে ইঞ্জিনিয়ার দল দ্রুত সমাধান করে দ্বিতীয় পরীক্ষায় তা দূর করতে সক্ষম হয়। এই সাফল্য মিশনের সময়সূচি বজায় রাখতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি হ্রাস করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান এক্স প্ল্যাটফর্মে মিশনের অগ্রগতির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি এই সফল পরীক্ষাকে চাঁদে ফিরে আসার পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মন্তব্য মিশনের জনসাধারণের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আর্টেমিস‑২ চাঁদের পৃষ্ঠের রেডিয়েশন, চৌম্বকীয় ক্ষেত্র এবং সূর্যালোকের প্রভাব সম্পর্কে নতুন তথ্য সরবরাহ করবে। পাশাপাশি, কক্ষপথে থাকা অবস্থায় উচ্চ রেজোলিউশনের ছবি ও স্পেকট্রাল ডেটা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ চাঁদ‑ভিত্তিক গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলবে।
আর্টেমিস‑২ কেবল চাঁদের কক্ষপথে ফিরে আসা নয়, ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানব মিশনের প্রস্তুতি হিসেবেও কাজ করবে। চাঁদের পরিবেশে পরিচালিত পরীক্ষাগুলি দীর্ঘ দূরত্বের মহাকাশযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি, যেমন জীবন সমর্থন ব্যবস্থা ও রেডিয়েশন শিল্ডিং, যাচাই করবে।
অ্যাপোলো‑১৭ মিশনের পর ৫০ বছরের বেশি সময়ে প্রথমবার নাসা মানবকে চাঁদের কক্ষপথে পাঠাবে, যা মহাকাশ অনুসন্ধানের নতুন যুগের সূচনা চিহ্নিত করবে। এই মিশনের সফলতা আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতার জন্যও ইতিবাচক সংকেত দেবে এবং ভবিষ্যৎ যৌথ প্রকল্পের পথ প্রশস্ত করবে।
আর্টেমিস‑২ সফল হলে নাসা পরবর্তী ধাপ হিসেবে আর্টেমিস‑৩ মিশনের পরিকল্পনা চালিয়ে যাবে, যেখানে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিগত গবেষণা করা হবে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে মিশনের সময়সূচি ও প্রস্তুতি যথাযথভাবে অগ্রসর হচ্ছে।



