অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগে নিজের বাসভবনে বন্দর ব্যবহারকারীদের ফোরামের সঙ্গে বৈঠকের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দেন। তিনি জানান, আমদানি করা কাঁচামাল ও পণ্য চার দিনের মধ্যে শুল্কায়ন ও খালাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য বন্দর কার্যক্রমে গতি আনা এবং লজিস্টিক্স খরচ কমিয়ে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কমিশনার শফিউদ্দিন, এডিশনাল কমিশনার তাফসির উদ্দিন ভূঁইয়া, হারবার এন্ড মেরিনের সদস্য কমডোর আহমেদ আমিন আবদুল্লাহ এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক সমিতির নেতারা। মন্ত্রীর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে, তবে কিছু বিষয়ের জন্য আন্তঃমন্ত্রণালয়ীয় সমন্বয় প্রয়োজন এবং তা সম্পন্ন হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
সমস্যা সমাধান হলে বন্দর কার্যক্রম দ্রুত হবে, পণ্য খালাসের সময় কমে যাবে এবং সংশ্লিষ্ট খরচ হ্রাস পাবে বলে মন্ত্রী আশ্বাস দেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে অধিকাংশ স্ক্যানিং মেশিন দীর্ঘদিন অচল থাকায় গুদামজাত পণ্যের জট এবং সরবরাহের ধীরগতি বেড়েছে। এই যন্ত্রপাতি দ্রুত সচল করার জন্য তিনি কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের ত্বরিত পদক্ষেপের আহ্বান জানান এবং বলেন, এ ধরনের অবহেলা কোনোভাবে সহ্য করা হবে না।
এই নির্দেশনা নতুন সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীর প্রথম চট্টগ্রাম সফরের অংশ। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গৃহীত নীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক পরিবেশকে সহজতর করা এবং রপ্তানি-আমদানি প্রক্রিয়ার দক্ষতা বাড়ানো অন্যতম লক্ষ্য। বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে মন্ত্রী যে সমস্যাগুলো শনাক্ত করেছেন, সেগুলোর দ্রুত সমাধান দেশের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা বাড়াবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন।
স্ক্যানিং মেশিনের অচলাবস্থা সরাসরি লজিস্টিক্স খরচে প্রভাব ফেলছে; পণ্যের গুদামজাত সময় বাড়ার ফলে সংরক্ষণ ও বীমা খরচ বৃদ্ধি পায়। চার দিনের মধ্যে খালাসের লক্ষ্য অর্জিত হলে এই অতিরিক্ত ব্যয় কমে যাবে, ফলে আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহারকারী শিল্পগুলো—যেমন গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স ও রসায়ন—বাজারে দ্রুত পণ্য সরবরাহ করতে পারবে। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খলের নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে এবং শেষ গ্রাহকের কাছে পণ্যের দাম স্থিতিশীল হতে পারে।
বন্দর পরিচালনায় গতি আসলে বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়ও বাড়বে। দ্রুত খালাসের ফলে কাস্টমসের সংগ্রহযোগ্য শুল্ক ও কর দ্রুত রিকভারি হবে, যা সরকারি রাজস্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোকে দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা থেকে মুক্তি পাবে, ফলে তাদের কার্যকরী মূলধন মুক্ত হবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু মন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ীয় সমন্বয় প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সমাধান হতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে, যা স্বল্পমেয়াদে সম্পূর্ণ চার দিনের লক্ষ্য অর্জনে বাধা হতে পারে। তদুপরি, স্ক্যানিং মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত আপডেটের জন্য অতিরিক্ত বাজেট ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। এসব বিষয় সমাধান না হলে বন্দর কার্যক্রমে পুনরায় ধীরগতি দেখা দিতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি চার দিনের লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান রপ্তানি-আমদানি হাব হিসেবে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। দ্রুত খালাসের ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনের নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করবে। একই সঙ্গে, স্থানীয় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোকে সময়মত পণ্য পাওয়া যাবে, যা উৎপাদন পরিকল্পনা ও বিক্রয় কৌশলকে স্থিতিশীল করবে।
মন্ত্রীর এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের উপর। যদি স্ক্যানিং মেশিন দ্রুত সচল হয় এবং আন্তঃমন্ত্রণালয়ীয় সমন্বয় দ্রুত সম্পন্ন হয়, তবে চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে লজিস্টিক্স খরচের হ্রাস এবং বাণিজ্যিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি প্রত্যাশা করা যায়। অন্যথায়, অস্থায়ী অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী না হয়ে পুনরায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর চার দিনের মধ্যে পণ্য খালাসের নির্দেশনা বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক্স খরচ এবং দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সমন্বয়, প্রযুক্তিগত আপডেট এবং বাজেটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। ভবিষ্যতে বন্দর কার্যক্রমের গতি এবং শুল্ক সংগ্রহের দক্ষতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



