সিলেট বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে আদিবাসী শিশুদের পড়াশোনার হার বাড়াতে তাদের মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই নীতি ২০২০ সালে প্রি-প্রাইমারি থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত হয় এবং এই বছর ৩৫টি স্কুলে ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি ভাষার বই বিতরণ করা হয়েছে।
বিতরণকৃত বইগুলোকে ক্লাসরুমে ব্যবহার করার জন্য যথাযথ পরিকল্পনা, সমন্বয় ও শিক্ষক ব্যবস্থা না থাকায় শিক্ষার্থীদের জন্য তা সীমিত প্রভাব ফেলছে। আদিবাসী ভাষায় শিক্ষাদানের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক না থাকায়, বইগুলো শেলফে জমে থাকে এবং শিক্ষার্থীরা সেগুলো থেকে উপকৃত হতে পারে না।
ইশাচড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক রঞ্জন শর্মা জানান, ২০১৯ সাল থেকে তিনি এই স্কুলে কাজ করছেন, তবে আদিবাসী ভাষার শিক্ষার জন্য কোনো শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, “বছরের শুরুতে আমরা কয়েকটি বই পেয়েছি, তবে শিক্ষক না থাকায় শিশুরা অক্ষর চেনা শিখতে পারছে না, ফলে বইগুলো ব্যবহার হয় না।”
ইশাচড়া গাওয়ার কুলাউরার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফেন্সিলা রেমা একই সমস্যার মুখোমুখি। তিনি বলেন, “গারো ভাষার নতুন বই পেয়েছি, কিন্তু শিক্ষক আমাদের ভাষায় পড়াতে পারেন না। আমার মা অশিক্ষিত, তাই বইয়ের শব্দগুলো বুঝতে পারছেন না। আমার বন্ধুরাও একই সমস্যায় আছে।”
সিলেটের আরেকটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দালুচড়া থেকে সায়ন দেববর্মা জানান, তিনি ও তার সহপাঠীরা মাতৃভাষায় বই পেয়ে আনন্দিত হলেও, শিক্ষক না থাকায় পাঠ্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন। ফলে শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে এবং শিশুরা স্কুল ছেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ২০১৭ সালে এই উদ্যোগের মাধ্যমে আদিবাসী শিশুদের পড়াশোনার হার বাড়াতে চেয়েছিল, তবে এখন পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পাঠ্যক্রমের সমন্বয় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বই বিতরণ সত্ত্বেও শিক্ষার ফলাফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, আদিবাসী ভাষায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের পরিকল্পনা শীঘ্রই কার্যকর করা হবে, তবে এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এই ঘাটতি দূর না করা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যকর করা কঠিন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বই বিতরণ ও শিক্ষকের অভাবের দ্বন্দ্বের ফলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিক্ষার উন্নয়ন ধীরগতি পাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ভাষাগত বাধার কারণে পাঠ্যবই থেকে সঠিকভাবে শিখতে পারছে না, ফলে তাদের একাডেমিক পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যৎ সুযোগসুবিধা প্রভাবিত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষা নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আদিবাসী ভাষায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, নিয়মিত শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠ্যক্রমের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
শিক্ষা ক্ষেত্রের এই চ্যালেঞ্জের সমাধান হিসেবে, অভিভাবক ও সম্প্রদায়ের সদস্যদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে বলা যায়। যদি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা ভাষা শিক্ষার সহায়তা প্রদান করেন, অথবা গ্রাম স্তরে ভাষা ক্লাব গঠন করা হয়, তবে শিশুরা মাতৃভাষায় পড়াশোনার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে।
আপনার এলাকার আদিবাসী শিক্ষার পরিস্থিতি কেমন? যদি আপনি কোনো সমাধান বা উদ্যোগের প্রস্তাব রাখতে চান, মন্তব্যে শেয়ার করুন।



