ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিউলেক্স প্রজাতির মশার সংখ্যা তীব্রভাবে বাড়ে, ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে কামড়ের অভিযোগ বাড়ছে। বিশেষ করে শীতের শেষের দিকে বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশার প্রজনন দ্রুত হয়েছে। শহরের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিভাগ এখন এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ত্বরান্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।
মিরপুর-১২ এলাকার এক প্রতিবন্ধী বাসিন্দা সাইফুল আলম গত এক মাস ধরে ঘন ঘন মশার কামড়ে কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি চলাচলে অক্ষম হওয়ায় বাড়ির ভিতরে বেশি সময় কাটান এবং দিনভর মশা জ্বালানি (কয়েল) জ্বালিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন। রাতের সময় বিশেষ করে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়, কারণ কিছু রেপেলেন্টের প্রভাবও কমে যায়।
মশা ও ডেঙ্গুর সংক্ষিপ্ত বিরতির পর ঢাকার বেশ কয়েকটি পাড়া আবার মশার আক্রমণের শিকার হয়েছে। শহরের দু’টি কর্পোরেশন যথাযথভাবে প্রজননস্থল পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় শীতের শুরু থেকে এই সমস্যায় তীব্রতা দেখা দিচ্ছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।
পল্লবী, মিরপুর, এসকাটন, রামনা, গ্যান্ডারিয়া, মোহাম্মদপুর, রাজারবাজার, তেজতুরী বাজার, উত্তরা, হাজারিবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাটিরপুল, মঘবাজার, পুরাতন ঢাকার কিছু অংশ, মান্দা, দোগাইর, দানিয়া, উত্তরখান এবং আদাবর এই এলাকাগুলোতে মশার ঘনত্ব বিশেষভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
রামনা এলাকার রফিকুল ইসলাম পাঁচ বছর ধরে এই এলাকায় বসবাসের পর প্রথমবারের মতো এত বেশি মশা দেখেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় কর্পোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, ফলে বাসিন্দারা অস্বস্তিতে ভুগছেন।
পশ্চিম রাজারবাজারের সুমি আক্তার জানান, জানালার সব দরজা-জানালা বন্ধ করেও মশা ঢুকে আসে। তাঁরা মশা জাল ব্যবহার করেন, তবু সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো বাড়ি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বশার উল্লেখ করেন, কিউলেক্স মশা দীর্ঘ সময়ের শুষ্ক আবহাওয়ায় বেশি বৃদ্ধি পায়। তিনি জানান, বর্তমান মশার ঘনত্ব গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি, যা অস্বাভাবিক বলে বিবেচিত।
শুষ্ক ও বৃষ্টিহীন সময়ে নগরের নিকাশী ও ড্রেনের পানি স্থবির হয়ে যায়। এতে জৈব পদার্থের সঞ্চয় লার্ভার খাবার সরবরাহ করে, ফলে মশার ডিম দ্রুত বিকশিত হয়। স্থবির পানিতে ডিমের ক্ষয় কমে যাওয়ায় প্রজননচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয়।
শীতের পর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ডিমগুলো দ্রুত অঙ্কুরিত হয়, ফলে প্রাপ্তবয়স্ক মশার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, এই সময়ে বাড়ির আশেপাশে কোনো স্থবির পানি না রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে লার্ভা গঠনের সুযোগ কমে।
নিবাসী ও কর্তৃপক্ষ উভয়েরই সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। বাসিন্দারা বাড়ির আশেপাশে জলে জমে থাকা পাত্র, টায়ার, পাত্র ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে পারেন এবং নিয়মিত মশা জাল ব্যবহার করতে পারেন। একই সঙ্গে শহরের পরিষেবা বিভাগকে নিকাশী পরিষ্কার করা, অপ্রয়োজনীয় পানির সঞ্চয় রোধ করা এবং মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত স্প্রে কার্যক্রম চালু করার জন্য ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এই সমন্বিত ব্যবস্থা মশার আক্রমণ কমিয়ে রোগের ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করবে।



