বাংলাদেশের ভাষা বৈচিত্র্যের অবস্থা এখন শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলা বিশ্বে প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে এক, যার স্বদেশীয় বক্তা প্রায় দুই কোটি পঞ্চাশ লাখ। এই সংখ্যা অনুযায়ী বাংলা বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক কথিত ভাষা।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে বসবাসকারী প্রায় দুই কোটি পঞ্চাশ লাখ মানুষ বাংলা মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। তবে দেশের অভ্যন্তরে বহু জাতিগত গোষ্ঠী ও চা বাগানের শ্রমিকরা বাংলা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যদিও তাদের নিজস্ব ভাষা এখনও সক্রিয়।
সরকারি তালিকায় খুদরা নৃ গোষ্ঠি (Khudra Nri Gosthi) নামে পরিচিত পঞ্চাশটি ছোট জাতিগত সম্প্রদায় অন্তর্ভুক্ত। এই গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি পরিবেশ ও মানব উন্নয়ন সংস্থা (SEHD) অতিরিক্ত পঞ্চাশটি কম পরিচিত সম্প্রদায়ের তথ্য সংগ্রহ করেছে। SEHD দুটি প্রকাশনায় এই তথ্য উপস্থাপন করেছে: “Lower Depths: Little‑known Ethnic Communities of Bangladesh” এবং “Slaves in These Times: Tea Communities of Bangladesh”।
এই সমস্ত বাংলা‑বহির্ভূত গোষ্ঠী মোট চল্লিশেরও বেশি ভাষা ব্যবহার করে। চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টে দশটি, চা বাগানে প্রায় এক ডজন এবং দেশের উত্তর‑পশ্চিম, উত্তর‑মধ্য ও উত্তর‑পূর্বাঞ্চলে অবশিষ্ট ভাষা ছড়িয়ে আছে।
অধিকাংশ আদিবাসী ও ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর মাতৃভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। কিছু ভাষার কোনো লিপি নেই, ফলে লিখিত রেকর্ডের অভাব রয়েছে। আজকের দিনে এই ভাষা প্রধানত বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যবহার কমে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কোচ গোষ্ঠীর ভাষা কোনো লিপি ছাড়া রয়েছে, ফলে শিক্ষার মাধ্যমে সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে প্রচলিত “জাংলি” ভাষা এই সংকটের এক স্পষ্ট উদাহরণ। চা বাগানের শ্রমিকরা প্রায়ই দাসত্বের সমতুল্য অবস্থায় কাজ করে, ফলে তাদের ভাষাগত ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকদের দৈনন্দিন কাজের চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ভাষা শেখা ও ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করে।
কিছু ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভাষা সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, বান্দরবন হিল জেলা থেকে চ্যাক (বা সাক) গোষ্ঠী প্রায় চার হাজারের কম জনসংখ্যা নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ভাষা বজায় রেখেছে। এই ভাষা তার স্বতন্ত্র ধ্বনিবিজ্ঞান ও শব্দভাণ্ডার দিয়ে ভাষাবিদদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাষাগুলোর সংরক্ষণ কেবল সাংস্কৃতিক দায়িত্ব নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নেরও অংশ। ভাষা বৈচিত্র্য শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে সহায়তা করে, পাশাপাশি স্থানীয় ইতিহাস ও পরিচয়কে শক্তিশালী করে।
তবে বাস্তবিক চ্যালেঞ্জগুলো বেশ জটিল। লিপি না থাকা ভাষার জন্য পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষামূলক উপকরণ বা ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করা কঠিন। পাশাপাশি, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষা শেখার আগ্রহের অভাব ও শহুরে কর্মসংস্থানের দিকে ঝোঁক ভাষা হ্রাসের গতি ত্বরান্বিত করে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্প্রদায়ভিত্তিক উদ্যোগ ও সরকারী নীতি সমন্বয় প্রয়োজন। স্থানীয় বিদ্যালয়গুলো যদি এই ভাষাগুলোকে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে, অথবা ভাষা সংরক্ষণ প্রকল্পে তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়, তবে ভবিষ্যতে ভাষা হারানোর ঝুঁকি কমে আসবে।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: আপনার আশেপাশের কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর ভাষা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন, স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা ভাষা কর্মশালায় অংশ নিন, এবং সামাজিক মিডিয়ায় এই ভাষার রেকর্ড শেয়ার করুন। এভাবে প্রত্যেকের ছোট অবদান ভাষা বৈচিত্র্যের সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আপনি কি আপনার এলাকার কোনো অজানা ভাষা সম্পর্কে জানেন? সেই ভাষা কীভাবে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে ভাবুন এবং সম্ভব হলে স্থানীয় সংরক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করুন।



