আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টের বাওম ভাষা সংক্রান্ত পরিস্থিতি আলোচিত হয়। বাওম, কুকি-চিন শাখার একটি ভাষা, যা ছোট আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে মৌখিক ও লিখিত ঐতিহ্য বজায় রাখে। তবে ভাষার টিকে থাকা এখন পরিবার, সম্প্রদায়িক সংগঠন এবং সরকারী নীতির সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল।
লালরিথাং বাওম, বাওম ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি, ভাষা ও পরিচয়ের অটুট সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। রুমার লায়রুনপি পাড়া-তে বড় হওয়ার সময় তিনি বাড়ি, গ্রামপথ, গির্জা ও দৈনন্দিন কথোপকথনে বাওম ব্যবহার করতেন এবং এখনো পরিবার ও সামাজিক সমাবেশে তা বজায় রাখেন। তার মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গল্প ও গানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া কমে যাচ্ছে, কারণ ডিজিটাল মিডিয়া ঐতিহ্যবাহী মিলনস্থলকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের অবকাঠামোও সীমিত। বাওম ভাষার পাঠ্যপুস্তক কম, প্রশিক্ষিত শিক্ষক সংখ্যা অপর্যাপ্ত, এবং সরকারি সহায়তা যথেষ্ট নয়। এই ঘাটতি প্রজন্মান্তর ভাষা স্থানান্তরে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দুই থেকে তিন দশকে ভাষা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।
একই সময়ে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী বাওম শিক্ষার্থীও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গির্জা ও সাহিত্যিক কার্যক্রমে বাওম এখনও সক্রিয়, তবে দৈনন্দিন জীবনে বাংলা ভাষা প্রাধান্য পায়। শহরে বসবাসকারী শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা কথ্য বাওমে দক্ষ, তবে লিখিত দক্ষতা কম, ফলে শব্দভাণ্ডার, প্রবাদপ্রবচন ও ঐতিহ্যবাহী বর্ণনা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
যুব বাওম সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জম লালথার্নগাক বাওম, নিউ ইডেন গ্রামে বড় হওয়ার সময় বাওম ভাষা জীবনের প্রতিটি দিককে স্পর্শ করত। তিনি ভাষাকে পরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল স্তম্ভ হিসেবে দেখেন, তবে সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে ব্যবহার কমে যাওয়া লক্ষ্য করেছেন। এই প্রবণতা ভাষার টিকে থাকার জন্য জরুরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
বাওম ভাষা সংরক্ষণের জন্য সম্প্রদায়িক উদ্যোগ বাড়ছে। তরুণ সদস্যরা সামাজিক মিডিয়ায় ভাষা শিখন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে অনলাইন গ্রুপ গঠন করেছে। পাশাপাশি, স্থানীয় গির্জা ও স্কুলে বাওমের মৌলিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা চলছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ভাষার ব্যবহারিক ক্ষেত্র বিস্তৃত করা এবং তরুণদের মধ্যে লিখিত দক্ষতা বাড়ানো লক্ষ্য।
সরকারের দিক থেকে এখনো স্পষ্ট নীতি গঠন বাকি। ভাষা সংরক্ষণে আর্থিক সহায়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের পরিকল্পনা প্রয়োজন। যদি এই ধরনের কাঠামোগত সহায়তা না আসে, তবে বাওমের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়বে।
শিক্ষা ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন, বাওম ভাষা শিক্ষাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা এবং স্থানীয় শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা উচিত। এছাড়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাওমের গল্প, গান ও কবিতা সংরক্ষণ ও প্রচার করা ভাষার পুনরুজ্জীবনে সহায়ক হবে।
বাওম ভাষা সংরক্ষণে সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান, তবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। ভাষা না থাকলে সংস্কৃতি ও পরিচয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
আপনার আশেপাশে যদি কোনো আদিবাসী ভাষা থাকে, তবে তার ব্যবহার ও শিক্ষায় কীভাবে সহায়তা করতে পারেন, তা নিয়ে চিন্তা করুন। ভাষা সংরক্ষণে আপনার ছোট্ট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



