১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে বাঙালি ছাত্রদের নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলন গৃহীত হয়, যেখানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতির দাবি তীব্রভাবে প্রকাশ পায়। আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আরবীকে একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণার বিরোধিতা এবং বাঙালি জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করা। এই দাবির জন্য ছাত্র, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে প্রতিবাদ, র্যালি ও ধর্মঘটের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে, যা শেষ পর্যন্ত ২১ ফেব্রুয়ারি শিহরণময় রক্তক্ষয়ী ঘটনার দিকে নিয়ে যায়।
ভাষা আন্দোলনের শিকড় ১৯৪৮ সালের প্রথম পর্যায়ে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তবে চার বছরের মধ্যে আন্দোলন বিস্তৃত হয়ে পুরো পূর্ব পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় পর্যায়ে সংগঠনের তৎপরতা, সচেতনতা ও প্রদেশব্যাপী সমর্থন বৃদ্ধি পায়, ফলে আন্দোলনকে গুণগতভাবে ভিন্ন রূপ দেয়া যায়। এই সময়ে বুদ্ধিজীবী ও লেখক বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনকে মুসলমান বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে তারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা, বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য ও রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি অর্জনের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যায়।
বদরুদ্দীন উমরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণ ঘটায় এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করে। তিনি উল্লেখ করেন যে, আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্রভাষা বাংলা স্বীকৃতির পাশাপাশি পহেলা বৈশাখের মতো সাংস্কৃতিক উৎসবের সরকারী স্বীকৃতি পায়, যা পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান মধ্যবিত্তের বৃহৎ মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক গর্বকে প্রকাশ করে। এই স্বীকৃতি সরকারী নথিতে যদিও সীমিতভাবে উল্লেখিত হয়, তবে বাস্তবে তা বাঙালি সমাজের আত্মপরিচয়ের মূল স্তম্ভ হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানি শাসকগণ আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় গুলিবর্ষণ, হত্যাযজ্ঞ এবং কঠোর দমন নীতি গ্রহণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২-এ মেডিকেল কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণে শিহরণময় রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে, যেখানে বহু ছাত্র শহীদ হয়। এই রক্তাক্ত দিনকে স্মরণ করে ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়, তবে তা মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে ধ্বংস করা হয়।
এক বছর পর, ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ শহীদ দিবসের ঘোষণার আহ্বান জানায়। এই আহ্বানকে সাধারণ জনগণ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে এবং প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী শহীদ দিবসকে সম্মানজনকভাবে পালন করা হয়। শহীদ দিবসের উদযাপন ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল থেকে শুরু হয়ে দ্রুত অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে, যা বাঙালি জাতীয় চেতনার ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভাষা আন্দোলনের সাফল্য পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য শক্তিশালী প্রেরণা সরবরাহ করে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিশাল জয়লাভ করতে সাহায্য করে এবং পরবর্তীতে ১৯৬৬-১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি গড়ে তোলে। আজও ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত, যা বাঙালি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার প্রতীক।
ভবিষ্যতে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে জাতীয় সংহতি, ভাষা নীতি ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত আলোচনায়। সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই এই ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে জনগণের সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করবে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপথকে গঠন করবে।



