২০ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রাতে, ঢাকা শহরের আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের সমাধি সমীপে জামায়াত‑ইসলামির আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এক বিশেষ সমাবেশে উপস্থিত হয়ে ভাষা আন্দোলনের ৭২তম বার্ষিকী উদযাপন করেন। সমাবেশে ফাতেহা, সুরা ইখলাসের তেলাওয়াত এবং বিশেষ মোনাজাতের পর তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান উল্লেখ করেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্র ও তরুণরা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ ঝুঁকিয়ে লড়াই করে শহীদ হয়েছেন। আজিমপুরের ভাষা সৈনিকদের সমাধিতে করা এই সমাবেশে তাদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে প্রার্থনা করা হয় এবং ১৯৫২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অধিকার অর্জনের পথে প্রাণ হারানো সকলের জন্য দোয়া করা হয়।
তিনি অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ১৯৪৭‑এর ভাগ্যভাগ, ১৯৫২‑এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১‑এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০‑এর গণতান্ত্রিক পরিবর্তন এবং ২০০৬‑২০২৪ পর্যন্ত চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলোতে স্বার্থপর সরকারগুলো জনগণের মৌলিক অধিকারকে জোরে চেপে ধরার চেষ্টা করেছে। এই দমনমূলক নীতির প্রতিক্রিয়ায় সময়ে সময়ে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের ঢেউ দেখা গেছে।
ভাষা অধিকার অর্জিত হলেও, নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এটাই তার মূল বক্তব্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতার পরেও ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়নি; ১৯৪৭‑এর বঞ্চনা ও ১৯৫২‑এর সংগ্রামের মতোই আজও ন্যায়বিচারের ঘাটতি বিদ্যমান।
শহীদদের ত্যাগের মাধ্যমে তিনি এক বার্তা দেন যে, সংগ্রাম ছাড়া অধিকার ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের শেখায় যে, যদি আমরা দৃঢ়ভাবে লড়াই করি তবে অধিকার অর্জন করা যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি উল্লেখ করেন, এই সংগ্রাম কোনো একক গোষ্ঠীর জন্য নয়; কৃষক, শ্রমিক, মাঝি‑মেহনতি মানুষসহ সকল স্তরের মানুষের মুক্তি ও ন্যায়ের জন্যই এই আন্দোলন গড়ে উঠেছে।
তাঁর মতে, তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন পূরণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব রয়েছে। তিনি যুবকদের বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য অর্জনে পাশে থাকার অঙ্গীকার প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুনাগরিক গড়ে তুলতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষণে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তোলা পর্যন্ত লড়াই থামবে না। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন যেখানে ন্যায়বিচার নিশ্চিত, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি নির্মূল এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে।
শহীদদের রক্ত বৃথা না যেতে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করে তিনি বলেন, জাতির অধিকার পুনরুদ্ধার করতে নিজেদের প্রাণ দান করলেও হেঁচড়া হবে না। এই সংকল্পের ভিত্তিতে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে ধারাবাহিক আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন।
এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, জামায়াতের এই ধরনের ভাষা দিবসের বক্তৃতা দেশের মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা সংক্রান্ত আলোচনাকে তীব্র করে তুলতে পারে। সরকার যদি এই দাবিগুলোকে উপেক্ষা করে, তবে ভবিষ্যতে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন ও বিরোধের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অন্যদিকে, সরকার যদি ন্যায়বিচার ও দুর্নীতি মোকাবেলায় বাস্তবিক পদক্ষেপ নেয়, তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস পেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, আজিমপুরের ভাষা শহীদ সমাধিতে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান ভাষা অধিকার অর্জনের পরেও নাগরিক অধিকার সম্পূর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং ভবিষ্যতে মানবিক, ন্যায়সঙ্গত ও নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়েছেন।



