আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) শিবিরের সদস্যরা শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সম্মানসূচক অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি রাত ১২:৪৮ মিনিটে, ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে দেখা যায়। তবে শিবিরের সব সদস্যই অংশগ্রহণের তথ্য প্রকাশ না করার অভিযোগে এক উচ্চপদস্থ সদস্যের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
ডাকসু কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা ফেসবুকে শেয়ার করা স্ক্রিনশটের মাধ্যমে তার বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বিটিভি‑এর সম্প্রচারের মাধ্যমে জানা গেল শিবিরের কিছু সদস্য শহীদ মিনারে ফুলের তোড়া অর্পণ করতে গেছেন, যা তিনি ‘বদৌলো’ শব্দে ব্যঙ্গাত্মকভাবে বর্ণনা করেন। তার পোস্টে উপস্থিত নামগুলোর মধ্যে হেমা চাকমা, ফাতেমা তাসনিম জুমা, রাফিয়া, উম্মে সালমা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত, তবে তিনি শিবিরের সমগ্র সদস্যবৃন্দের অংশগ্রহণের তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন।
সর্ব মিত্রের শেয়ার করা স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ডাকসু ভাইস প্রেসিডেন্ট সাদিক কায়েম এবং সাধারণ সম্পাদক এস.এম. ফরহাদ সহ কয়েকজন সদস্য শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতি স্পষ্ট না হলেও, ছবিতে দেখা যায় তারা ফুলের তোড়া অর্পণ এবং সম্মানসূচক রিবন বেঁধে মিনার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
শিবিরের এই অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের পটভূমিতে রয়েছে শিবিরের নেতৃত্বের প্রতি কিছু সদস্যের অসন্তোষ, বিশেষ করে অনুষ্ঠান সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন। সর্ব মিত্রের প্রকাশিত পোস্টটি শিবিরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের ঘাটতি এবং কিছু সদস্যের অংশগ্রহণের স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণে সৃষ্ট অস্বস্তি তুলে ধরেছে।
ইতিপূর্বে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম ঘন্টায় ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মানসূচক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। উভয় নেতার উপস্থিতি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের দ্বারা এই ঐতিহাসিক দিবসের গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করে। তাদের অংশগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে শিবিরের নিজস্ব উদ্যোগের তুলনা করা হয়, যা অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের সূত্রপাতের একটি কারণ হতে পারে।
ডাকসু শিবিরের নেতৃত্বের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তবে শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও যোগাযোগের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। শিবিরের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকলে ভবিষ্যতে অনুরূপ অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণের হার কমে যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেন, শিবিরের এই অভ্যন্তরীণ বিরোধ ছাত্র রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে প্রভাব ফেলতে পারে। শিবিরের নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষতি হলে, ছাত্র সংগঠনের কার্যকারিতা ও প্রভাব কমে যেতে পারে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপথকে পরিবর্তন করতে পারে।
অন্যদিকে, সর্ব মিত্রের প্রকাশিত অসন্তোষের ফলে শিবিরের ভেতরে স্বচ্ছতা ও সমন্বয়ের দাবি তীব্র হতে পারে। শিবিরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বিশেষত জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে, আরও সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি গ্রহণের সম্ভাবনা দেখা যায়।
শিবিরের সদস্যদের মধ্যে এই ধরনের মতবিরোধের সমাধান না হলে, শিবিরের অভ্যন্তরীণ ঐক্যহীনতা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কারণ, ছাত্র সংগঠনগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তাদের কার্যক্রমে পার্টির নীতি ও দিকনির্দেশনা প্রভাব ফেলে।
সর্ব মিত্রের ফেসবুক পোস্টে উল্লেখিত ‘বদৌলো’ শব্দটি শিবিরের অভ্যন্তরীণ সমালোচনার সূচক হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা শিবিরের নেতৃত্বকে ভবিষ্যতে আরও স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
শিবিরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, এই ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ হবে। শিবিরের নেতৃত্ব যদি সদস্যদের উদ্বেগকে সমাধান করে, তবে শিবিরের ঐক্য ও কার্যকারিতা বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় স্তরের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আরও সমন্বিতভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই অনুষ্ঠানটি দেশের সর্বোচ্চ নেতাদের উপস্থিতি এবং ছাত্র সংগঠনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত রয়ে গেছে। তবে শিবিরের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের সমাধান না হলে, ভবিষ্যতে এমন অনুষ্ঠানগুলোতে সমন্বয় ও স্বচ্ছতার অভাব দেখা দিতে পারে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ফেলতে পারে।



