মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের রায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশ-নির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের প্রচেষ্টা অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। রায়টি হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য নীতি নিয়ে দীর্ঘকালীন বিতর্কের নতুন মোড় এনে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ আইন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে হোয়াইট হাউসের রোজ গার্ডেন থেকে “লিবারেশন ডে” নামে একটি অনুষ্ঠান করে ব্যাপক শুল্ক তালিকা প্রকাশ করেন। একই সময়ে ইউরোপীয় দেশগুলোকে গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের পরিকল্পনা সমর্থন না করলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। ইউরোপীয় নেতারা এই হুমকিকে তীব্র বিরোধের সূচনা হিসেবে দেখেছেন এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
শুল্কের হঠাৎ বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলকে ব্যাহত করে, রপ্তানিকারীদের খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে চীন থেকে পোশাক ও খেলনা রপ্তানির পরিমাণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এই প্রবণতাকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় কেবল কিছু শুল্ককে অবৈধ করে, তবে সব শুল্ককে বাতিল করে না। ট্রাম্পের কর্মকালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী পণ্যগুলোর উপর আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কের বেশিরভাগই এখনো কার্যকর। অবৈধ ঘোষিত শুল্কগুলো মূলত পারস্পরিক শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা নির্দিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বিরোধের অংশ ছিল।
লিবারেশন ডে পরবর্তী আলোচনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি করা দেশগুলোকে গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়েছিল। রায়ের ভিত্তিতে এই গড় হার তাত্ত্বিকভাবে অর্ধেকের কমে ৭-৮ শতাংশে নেমে আসবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। তবে এই হ্রাসের ফলে আমদানিকর্তাদের প্রকৃত খরচে কতটা সাশ্রয় হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে রায়টি শুধুমাত্র পারস্পরিক শুল্কের ওপর কেন্দ্রীভূত, ফলে অন্যান্য রূপে আরোপিত শুল্কের গড় হার এখনও ৬ শতাংশের উপরে রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের শুরুর গড় শুল্কের তুলনায় এটি প্রায় তিন গুণ বেশি। এই উচ্চ শুল্কের স্তর মূলত কৃষি, টেক্সটাইল এবং ইলেকট্রনিক্সের কিছু বিভাগে প্রযোজ্য।
উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী স্টিল, ফার্মাসিউটিক্যাল এবং গাড়ি শিল্পে আরোপিত সেক্টরাল শুল্ক রায়ের আওতায় নয়। তাই এই ক্ষেত্রগুলোতে শুল্কের হার অপরিবর্তিত থাকবে। যুক্তরাজ্য সরকার এই শুল্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা চালিয়ে যাবে।
শুল্কের মোট সংগ্রহের পরিমাণ দেখলে গত বছর গড়ে প্রায় ১১ শতাংশ শুল্ক আদায় করা হয়েছে। এই সংখ্যা নির্দেশ করে যে বেশিরভাগ আমদানিকর্তা এখনও উচ্চ শুল্কের স্তরে কাজ করছে। রাজস্বের এই অংশটি ফেডারেল বাজেটের ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনেক আমদানিকর্তা চীনের মতো উচ্চ শুল্কযুক্ত দেশ থেকে সরবরাহ চেইন পরিবর্তন করে কম শুল্কযুক্ত বিকল্প দেশে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে চীনের পোশাক ও খেলনা রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ এখন নতুন সরবরাহকারী হিসেবে উল্লেখযোগ্য শেয়ার অর্জন করেছে।
কিছু আমদানিকর্তা শুল্কের অতিরিক্ত খরচ নিজে শোষণ করে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতির ওপর শুল্কের প্রভাব সীমিত হয়েছে। এই পদ্ধতি ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়া ধীর করে তুলেছে। সাম্প্রতিক ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) তে শুল্কের প্রভাবের চিহ্ন কমে যাওয়া দেখা গেছে।
হোয়াইট হাউসের আরেকটি লক্ষ্য হল শুল্ক থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বজায় রাখা, যা বাজেট ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রায়ের পরেও শুল্কের আয় বজায় রাখতে নীতি সমন্বয় করা হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে শুল্কের হার সমন্বয় বা নতুন শুল্ক কাঠামো প্রণয়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভবিষ্যতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অতিরিক্ত আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে অথবা নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং শুল্কের হার পুনর্মূল্যায়ন পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেসও শুল্ক নীতি সংশোধন নিয়ে আলোচনায় জড়িত হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির একটি বড় অংশকে অবৈধ করে তুললেও, শুল্কের গড় স্তর ও তার অর্থনৈতিক প্রভাব তাত্ক্ষণিকভাবে কমবে না। বাণিজ্য নীতি কীভাবে বিকশিত হবে তা এখনো অনিশ্চিত, এবং পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।



