সৌদি আরব রিয়াদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সম্প্রতি একটি বৃহৎ ফাইবার অপটিক ক্যাবল প্রকল্পের রুটে ইসরাইলকে বাদ দিয়ে সিরিয়াকে ট্রানজিট দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সিরিয়া থেকে গ্রীসের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের তথ্যপ্রবাহে নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে গাজা অঞ্চলে ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং তার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক উত্তেজনা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি প্রায় চার হাজার কিলোমিটার লম্বা ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখে, যার মাধ্যমে সিরিয়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ডেটা ট্রাফিকের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। রিয়াদের সূত্র অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রীসের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদান সম্ভব হবে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং ইসরাইলকে গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন। এই রাজনৈতিক পরিবেশে রিয়াদের সিদ্ধান্ত ইসরাইলের সঙ্গে কোনো দৃশ্যমান সংযোগ বজায় রাখার ইচ্ছা না থাকা স্পষ্ট করে। ফলে, সিরিয়া এখন সৌদি আরবের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়েছে।
সৌদি আরব সরকার সিরিয়ার টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে প্রায় ৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এই অর্থায়ন মূলত ফাইবার অপটিক ক্যাবল নেটওয়ার্কের নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সুবিধা উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে। সিরিয়ার বিদ্যমান টেলিকম সিস্টেমকে আধুনিকায়ন করে তথ্য প্রবাহের গতি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের মূল ধারণা ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘ইস্ট টু মেড ডেটা করিডোর’ নামে পরিচিত হয়। তখন সৌদি-ইসরাইল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আলোচনায় ছিল, এবং উভয় দেশের মধ্যে তথ্য সংযোগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে গাজা সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে এই সমীকরণ সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে, যা রিয়াদের নীতি পরিবর্তনের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রিয়াদের এই কৌশলগত পরিবর্তন ইসরাইলের সঙ্গে কোনো সরাসরি সংযোগ না রাখার স্পষ্ট সংকেত। পরিবর্তে সিরিয়াকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে সৌদি আরবের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর লক্ষ্য দেখা যায়। সিরিয়ার ভূগোলিক অবস্থান ও তার রাজধানী দামেস্ককে রেল, সড়ক এবং ক্যাবল নেটওয়ার্কের প্রধান হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
দামেস্কের মাধ্যমে গ্রীসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হলে গ্রীসের কূটনৈতিক অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে গ্রীস ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তবে রিয়াদের প্রস্তাব গ্রীসের জন্য নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি গ্রীসকে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের পরিবর্তে সিরিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলতে বাধ্য করতে পারে।
সৌদি আরবের এই উদ্যোগের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তথ্য অবকাঠামোতে নতুন গতিপথ তৈরি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সিরিয়া-গ্রীস সংযোগের মাধ্যমে ডেটা ট্রান্সমিশন সময় কমে যাবে এবং অঞ্চলীয় ব্যবসা ও বাণিজ্যের জন্য নতুন সুযোগ উন্মুক্ত হবে। একই সঙ্গে, ইসরাইলকে বাদ দেওয়া সিদ্ধান্ত ইসরাইল-সৌদি সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দেন, রিয়াদের এই পদক্ষেপ কেবল ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার না করে, বরং সিরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বন্ধনকে শক্তিশালী করার একটি কৌশলগত চাল। ভবিষ্যতে রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে এমন ক্যাবল সিস্টেমের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক মানচিত্র পুনর্গঠন হতে পারে।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের নির্মাণ কাজের সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি, তবে বিনিয়োগের মূলধন ও রুটের পরিকল্পনা ইতিমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। রিয়াদ সরকার এই প্রকল্পকে আঞ্চলিক সংযোগের নতুন মাইলফলক হিসেবে উপস্থাপন করেছে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার লক্ষ্যে কাজ করছে।
এই উদ্যোগের পরবর্তী ধাপ হিসেবে রিয়াদ সিরিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকল্পের বিস্তারিত নকশা চূড়ান্ত করবে এবং গ্রীসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সংযোগের প্রযুক্তিগত দিক নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে, ইসরাইলের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনও এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, মধ্যপ্রাচ্যের তথ্য অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ রূপান্তরে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।



