ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) পরিবহন মন্ত্রী রবিউল আলমের চাঁদাবাজি সম্পর্কিত মন্তব্যের কঠোর নিন্দা জানিয়ে একটি সংবাদ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। মন্ত্রী সড়কে চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতার ভিত্তিতে লেনদেন’ হিসেবে উল্লেখ করে যে রূপে প্রকাশ করেছেন, তা টিআইবির মতে গুরুতর অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই বিবৃতি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে টিআইবি সরকারপ্রধানের দুর্নীতি বিরোধী অঙ্গীকারের সঙ্গে মন্ত্রীর মন্তব্যকে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, মন্ত্রীর বক্তব্য চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধকে ‘সমঝোতা’ বলে উপস্থাপন করে মূলত তার বৈধতা স্বীকার করার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, এই রকম রেটোরিক্স দুর্নীতিবিরোধী নীতি ও সরকারপ্রধানের নির্বাচনী ইশতেহারকে ক্ষুণ্ন করে। টিআইবি তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রীর এই মন্তব্যের দ্রুত প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের শুদ্ধিকরণে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি করে।
টিআইবির প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মন্ত্রীর মন্তব্যের ফলে সড়ক ও পরিবহন খাতে ইতিমধ্যে বিদ্যমান চাঁদা সংস্কৃতি আরও বৈধতা পেতে পারে, যা পেশাজীবী, মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি ক্ষতি করে। তিনি সতর্ক করেন, যদি চাঁদাবাজিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিচার এবং প্রশাসনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতেও অনুরূপ নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে টিআইবি সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে তুলে ধরেছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও উল্লেখ করেন, মন্ত্রীর এই রকম মন্তব্য সরকারপ্রধানের দুর্নীতি প্রতিরোধের অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ এবং প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে দুর্বল করে। তিনি বলেন, পরিবহন মন্ত্রী চাঁদাবাজির সংজ্ঞা ইতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করে অনৈতিক ও যোগসাজশের দুর্নীতিকে সমর্থন করছেন, যা দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করে।
টিআইবি অতীতের উদাহরণ তুলে ধরে জানায়, ২০১২ সালে তৎকালীন সরকারও চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। সেই সময়ের নীতি ও আজকের মন্ত্রীর মন্তব্যের মধ্যে সাদৃশ্য দেখা যায়, যা নতুন সরকারকে একই পথে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানায়। টিআইবি এই বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে, এবং সরকারকে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়।
টিআইবি দাবি করে, মন্ত্রীর মন্তব্যের অবিলম্বে প্রত্যাহার এবং তার দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারপ্রধানের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি বলেন, এই ধরনের রেটোরিক্স কেবল দুর্নীতির শিকড়কে গভীর করে না, বরং জনসাধারণের বিশ্বাসকে ক্ষয় করে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, টিআইবির এই নিন্দা সরকারপ্রধানের দুর্নীতি বিরোধী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি কঠোর রাজনৈতিক সংকেত হতে পারে। যদি সরকার দ্রুত মন্ত্রীর মন্তব্য প্রত্যাহার করে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শুদ্ধিকরণে পদক্ষেপ নেয়, তবে এটি দুর্নীতি বিরোধী প্রচেষ্টার দৃঢ়তা প্রদর্শন করবে। অন্যদিকে, যদি কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে চাঁদা সংস্কৃতির বিস্তার এবং জনমতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি বাড়বে।
টিআইবি শেষাংশে উল্লেখ করে, চাঁদাবাজিকে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল একক খাতের নয়, সমগ্র দেশের উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলবে। তিনি সরকারকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারণে তৎপরতা দেখাতে হবে এবং মন্ত্রীর মন্তব্যের জন্য স্পষ্ট ও দায়িত্বশীল জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে চাঁদাবাজি সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায় এবং দুর্নীতি বিরোধী নীতির প্রতি জনসাধারণের আস্থা বজায় থাকে। ভবিষ্যতে এই ধরনের রেটোরিক্সের পুনরাবৃত্তি রোধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও নীতি সংশোধন প্রয়োজন হবে, যা দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করবে।



