ঢাকা শহরের দানমন্ডি এলাকায় মাইডাস সেন্টারে তিন দিনের ‘সুতর গল্প – নিজস্বত্বে বোনা উৎসব’ মেলা উদ্বোধন করা হয়েছে। ইদ‑উল‑ফিতরের পূর্বে ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতি (FEAB) এই ইভেন্টের আয়োজন করেছে, যেখানে দেশীয় ব্র্যান্ডের পণ্যগুলো এক ছাদের নিচে প্রদর্শিত হচ্ছে। মেলায় মোট উনচল্লিশটি স্থানীয় ব্র্যান্ড অংশগ্রহণ করেছে, যা পোশাক, গয়না, জুট, হস্তশিল্প, চামড়া এবং জৈব খাবারসহ বিভিন্ন সেক্টরকে অন্তর্ভুক্ত করে।
মেলায় উপস্থিত ছিলেন সিমূম মৌসুমি ব্রিস্টি, যিনি বেসরকারি খাতে কর্মরত এবং স্থানীয় ব্র্যান্ডের পণ্যকে স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বতন্ত্রতা হিসেবে প্রশংসা করেন। তিনি মাইডাস সেন্টারে একটি পোশাক ক্রয় করেন, যা তার পছন্দের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল – দেশের উৎপাদন এবং স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতা। তার মতই, রুম্পা ফারজানা, ঢাকা বাসিন্দা, অনলাইন শপিংয়ের তুলনায় সরাসরি পণ্য স্পর্শের অভিজ্ঞতাকে বেশি মূল্য দেন এবং স্থানীয় ব্র্যান্ডের প্রতি তার আস্থা জোরালো।
মেলায় বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেছে; দম্পতি, স্কুলের শিশুরা এবং একক ক্রেতা সবাই একত্রে ঘুরে দেখেছেন। ভিড়ের মধ্যে ইদের শপিং মৌসুমের উচ্ছ্বাস স্পষ্ট ছিল, যা স্থানীয় উৎপাদনের প্রতি ক্রমবর্ধমান চাহিদা নির্দেশ করে।
প্রদর্শনীর অন্যতম অংশগ্রহণকারী রেহমুমা হোসেন, যিনি ‘রিঙ্কি’স অ্যাটায়ার’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে সিলেটের মণিপুরি বুননকে বাজারে নিয়ে আসছেন। ২০১৯ সাল থেকে তিনি এই শিল্পে কাজ করছেন এবং স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে সরাসরি সহযোগিতা করে পণ্য তৈরি করেন। যদিও বাংলাদেশের হ্যান্ডলুমের সবচেয়ে পরিচিত নাম জামদানি, রেহমুমা তার কাজের জন্য মণিপুরি বুননকে বেছে নিয়েছেন, যা বাজারে বৈচিত্র্য আনছে।
ফ্যাশন উদ্যোক্তা সমিতির মতে, এই মেলা স্থানীয় উৎপাদনকারীদের সরাসরি ভোক্তাদের সঙ্গে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তিন দিনের মেলায় বিক্রয় ও অর্ডার সংখ্যা পূর্বের অনলাইন বিক্রয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় ব্র্যান্ডের বাজার শেয়ার বাড়াতে সহায়তা করবে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ইদের মতো বড় উৎসবের আগে স্থানীয় মেলাগুলি ভোক্তাদের কেনাকাটার প্যাটার্নে পরিবর্তন আনতে সক্ষম। সরাসরি পণ্য পরীক্ষা, মূল্য আলোচনা এবং স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে সংলাপের সুযোগ ভোক্তাদের অনলাইন শপিংয়ের সীমাবদ্ধতা পূরণ করে। ফলে, স্থানীয় ব্র্যান্ডের জন্য বিক্রয় চক্র স্বল্প সময়ের মধ্যে ত্বরান্বিত হতে পারে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী বেশ কয়েকটি জুয়েলারি ও লেদার ব্র্যান্ডও তাদের পণ্য প্রদর্শন করেছে, যা ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পকে আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে মিশ্রিত করে। জৈব খাবার স্টলগুলোতে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছেছে, যা কৃষি ও ফ্যাশন সেক্টরের সমন্বয়কে শক্তিশালী করে।
এই ধরনের সমন্বিত মেলা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য বহুস্তরীয় সুবিধা প্রদান করে। প্রথমত, উৎপাদনকারীদের বিক্রয় চ্যানেল বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়, যা একক চ্যানেলের ওপর নির্ভরতা কমায়। দ্বিতীয়ত, ভোক্তাদের জন্য পণ্যের গুণমান ও উৎপত্তি সম্পর্কে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়, যা ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। তৃতীয়ত, স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি অবদান রাখে, বিশেষ করে হস্তশিল্পী ও কারিগরদের জন্য।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, মেলাটি স্থানীয় মুদ্রা প্রবাহ বাড়াতে পারে। ভোক্তারা বিদেশি পণ্য বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বদলে দেশীয় পণ্য কেনার মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগ করছেন। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে পারে, যদি স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো মান ও ডিজাইনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, মেলার সফলতা বজায় রাখতে ধারাবাহিক মার্কেটিং ও গুণগত মানের উন্নতি প্রয়োজন। স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোকে ডিজিটাল উপস্থিতি শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মেলার পরেও অনলাইন চ্যানেলে বিক্রয় চালিয়ে যেতে পারে। এছাড়া, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা ও টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা বাড়বে।
সারসংক্ষেপে, ‘সুতর গল্প’ মেলা ইদের শপিং মৌসুমের পূর্বে স্থানীয় ফ্যাশন ও হস্তশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। ভোক্তাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা, ব্র্যান্ডের বৈচিত্র্য এবং স্থানীয় উৎপাদনের প্রতি বাড়তি আগ্রহ ভবিষ্যতে এই ধরনের ইভেন্টের চাহিদা বাড়াবে বলে আশা করা যায়।



