মিরসরাই জেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের বেদেপাড়া গ্রামে বসবাসরত ৪০ বছর বয়সী ইউসুফ আলী, চার সন্তানসহ পরিবারকে সমর্থন করার জন্য প্রতিদিন সকালে সরঞ্জাম নিয়ে গৃহস্থদের হারিয়ে যাওয়া সোনা‑রুপা খুঁজে বের করেন। তিনি গৃহের দরজার বাইরে বেরিয়ে গিয়ে গাছের গুঁড়ি, পুকুর, গর্ত ও পুরনো গৃহের আশেপাশে অনুসন্ধান চালান। কাজের ফলাফল অনিশ্চিত থাকলেও, সফল হলে দিনের আয় তার পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে যথেষ্ট হয়।
বেদেপাড়া গ্রামটি ঢাকা‑চট্টগ্রাম নতুন মহাসড়কের দু’পাশে বিস্তৃত, যেখানে টিনশেডের ঘরগুলো গলিতে সারি সারি সাজানো। গলির কোণে ছোট দালান ও দোকানগুলোতে বিশ্রামরত মানুষের ভিড় দেখা যায়, আর গৃহমধ্যে নারীরা চুলায় রান্না করে গন্ধ ছড়িয়ে দেয়। শিশুরা গলিতে দৌড়ে খেলতে থাকে, যা গ্রামটির জীবন্ত পরিবেশকে প্রকাশ করে।
ইউসুফের অনুসন্ধানী কাজের অভিজ্ঞতা দুই দশকের বেশি, এবং এ সময় তিনি অন্তত ২০ ভরির বেশি সোনার গয়না উদ্ধার করেছেন। তার কাজের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল তিন বছর আগে, যখন তিনি চট্টগ্রামের চকরিয়া উপজেলার মগবাজারে একটি গৃহস্থের পুকুর থেকে এক ভরি ওজনের সোনার চেইন বের করে আনেন। মালের মালিক তার সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে পাঁচ হাজার টাকা বকশিশ দিয়ে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বেদেপাড়া এলাকায় প্রায় চার হাজার মানুষ বসবাস করে, যার মধ্যে নারীরা মূলত দন্ত‑কানের পোকা ফেলা, তন্ত্র‑মন্ত্র ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী কাজের মাধ্যমে আয় করে। পুরুষদের কাজের পরিসরে বানর নাচ, ভাগ্য গণনা এবং সোনা‑রুপা অনুসন্ধান অন্তর্ভুক্ত। এই পেশা গ্রামটির প্রায় দুইশো লোকের জন্য প্রধান আয়ের উৎস, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চালিয়ে আসা একটি ঐতিহ্য।
ইউসুফের পাশাপাশি একই কাজের সঙ্গে যুক্ত অন্য কয়েকজন স্থানীয় হলেন মুক্তার হোসেন, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ আরাফাত এবং মোহাম্মদ মোরশেদ। প্রত্যেকেরই নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও গল্প রয়েছে, যা এই পেশার বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে। তারা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করে, যাতে গ্রাহকের হারানো গয়না দ্রুত সনাক্ত করা যায়।
শিক্ষা না থাকলেও ইউসুফের পেশা শুরু হয় ২২ বছর আগে, যখন তার বাবা নজরুল ইসলাম তাকে সোনা‑রুপা অনুসন্ধানের কৌশল শিখিয়ে দেন। বাবা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে তিনি নিজের হাতে পরিণত করে, গ্রাম ও আশেপাশের অন্যান্য উপজেলায় কাজের পরিধি বাড়িয়ে তুলেছেন। এখন তিনি মিরসরাইয়ের সীমানা অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সেবা প্রদান করেন।
তার কাজের ফলে অনেক পরিবার হারিয়ে যাওয়া গয়না পুনরুদ্ধার করে, যা তাদের আর্থিক সমস্যার সাময়িক সমাধান দেয়। একই সঙ্গে এই ধরনের অনানুষ্ঠানিক পেশা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি বিশেষ ভূমিকা রাখে, কারণ এটি শ্রমবিহীন মানুষকে কাজের সুযোগ দেয়। তবে এই কাজের বৈধতা ও নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও স্পষ্ট নয়।
বেদেপাড়া গ্রামটি নতুন মহাসড়কের কাছাকাছি হওয়ায়, শহরের মানুষও কখনো কখনো এখানে এসে সোনার সন্ধান করতে আসে। ইউসুফের মতো অনুসন্ধানকারীরা গৃহস্থদের হারানো গয়না দ্রুত সনাক্ত করে, ফলে গ্রাহকের বিশ্বাস অর্জন করে। এই বিশ্বাসই তাদের কাজকে টিকিয়ে রাখে এবং নতুন গ্রাহককে আকৃষ্ট করে।
সারসংক্ষেপে, ইউসুফ আলীর মতো লোকজনের প্রচেষ্টা স্থানীয় সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদান করে, যেখানে হারিয়ে যাওয়া সোনা‑রুপা পুনরুদ্ধার করে পরিবারকে আর্থিক স্বস্তি দেয়। পাঠকদের জন্য উল্লেখযোগ্য যে, যদি কোনো গয়না হারিয়ে যায়, তবে এই অঞ্চলের অভিজ্ঞ অনুসন্ধানকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা একটি বাস্তবিক সমাধান হতে পারে।



