আফগানিস্তানের তালেবান শাসনে সম্প্রতি গৃহীত আইন অনুযায়ী অপরাধের শাস্তি সামাজিক মর্যাদার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হবে, যা নারীর গৃহস্থ সহিংসতা মামলায় নতুন বাধা সৃষ্টি করেছে।
আইনটি সমাজকে চারটি স্তরে ভাগ করে, প্রত্যেক স্তরের জন্য ভিন্ন শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে। শীর্ষ স্তরে ধর্মীয় নেতা ও মোল্লা অন্তর্ভুক্ত, যাঁদের কোনো অপরাধে কেবল পরামর্শ বা নসিহত দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় স্তরে অভিজাত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি রয়েছে; এদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি পরামর্শ এবং প্রয়োজনে আদালতে তলব করা হতে পারে।
তৃতীয় স্তরে মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাঁদের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি কারাদণ্ড নির্ধারিত।
নিম্নবিত্ত বা শ্রমজীবী শ্রেণির জন্য কারাদণ্ডের পাশাপাশি শারীরিক বা বেত্রাঘাতের বিধান রাখা হয়েছে, যা পূর্বের আইনের তুলনায় কঠোর বলে বিবেচিত।
মানবাধিকার সংস্থাগুলি উল্লেখ করেছে, নতুন দণ্ডবিধিতে নারী ও ক্রীতদাসদের প্রায় একই স্তরে রাখা হয়েছে; স্বামীকে অনুমতি দিলে তিনি স্ত্রীকে শারীরিক শাস্তি দিতে পারেন, যা ‘তাজির’ হিসেবে চিহ্নিত।
এই ধারা অনুসারে গৃহস্থ সহিংসতা কার্যত রাষ্ট্রের স্বীকৃত রূপ পেয়েছে, ফলে নারীর সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
নাটো সমর্থিত পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে নারী নির্যাতনের জন্য তিন মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান ছিল; নতুন আইন এই শাস্তি কাঠামোকে বদলে শারীরিক শাস্তি যুক্ত করেছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, যদি কোনো নারী প্রমাণ করতে পারে যে স্বামীর দ্বারা মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন, তবে স্বামী সর্বোচ্চ পনেরো দিনের জেল শাস্তি পেতে পারেন।
তবে অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া নিজেই জটিল; নারীরকে আদালতে নিজের ক্ষতস্থান দেখিয়ে প্রমাণ দিতে হয়, একই সঙ্গে গোপনীয়তা বজায় রাখতে হয়, যা বাস্তবে কঠিন।
অধিকন্তু, গৃহস্থ নির্যাতনের মামলা দায়েরের জন্য নারীর স্বামীর অনুমতি নিতে হয় এবং আদালতে স্বামী বা অন্য কোনো পুরুষ অভিভাবক (মাহরাম) সঙ্গে উপস্থিত হতে হয়।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত স্বামীই নিজেই, ফলে স্বামীর অনুমতি ছাড়া মামলা দায়ের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
কাবুলের এক আইনি উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এক নারী জেলখানায় স্বামীকে দেখতে গিয়ে তালেবান প্রহরীর হাতে লাঞ্ছিত হন; বিচার চাইতে তাকে মাহরাম নিয়ে আসতে বলা হয়, কিন্তু তার একমাত্র মাহরাম স্বামী জেলখানায় বন্দী ছিলেন।
বিচার না পেয়ে তিনি জনসমক্ষে চিৎকার করে বলেন, “এই নরক যন্ত্রণার চেয়ে মৃত্যুই ভালো”, যা আইনটির মানবিক দিকের ত্রুটিকে প্রকাশ করে।
দণ্ডবিধির ৩৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, স্বামীর অনুমতি ছাড়া যদি কোনো নারী বারবার পিতার বাড়ি বা আত্মীয়ের বাসায় যান এবং স্বামীর অনুরোধ সত্ত্বেও না ফেরেন, তবে তাকে ও তার আশ্রয়দাতা পরিবারকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
এই বিধান নারীর চলাচল ও পারিবারিক স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে সমালোচিত হচ্ছে।
আইনের প্রয়োগে গৃহস্থ সহিংসতা আনুষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, ফলে তালেবান সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সহায়তা প্রাপ্তিতে প্রভাব পড়তে পারে।
মানবাধিকার সংস্থা ও কিছু দেশীয় গোষ্ঠী আইন সংশোধনের আহ্বান জানিয়ে চলেছে, যাতে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং শাস্তি নির্ধারণে সমতা বজায় থাকে।
অধিকন্তু, আইনের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে অনুমোদন ও সহায়তা প্রদান করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে তালেবান সরকারকে আইনের পুনর্বিবেচনা ও মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের চাপ বাড়ছে।



