বগুড়া জেলার নন্দীগ্রাম অধিবাসী ১৬ বছর বয়সী মিলন রহমান, বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১১টায় বুড়ইল গ্রামে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ অফিসার মিজানুর রহমানের মতে, একদল কিশোর-তরুণের আক্রমণে শিকারের দেহে একাধিক ছুরি আঘাত লেগে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিকারের দেহকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং মরণোত্তর পরীক্ষা চালু রয়েছে।
মিলন রহমান দিলবরের বাসিন্দা এবং স্থানীয় সরকারি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। তার পরিবার জানায়, শিকারের আগে তিনি কোনো গুরুতর রোগে ভুগছিলেন না এবং শিক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করছিলেন। শিকারের পূর্বে, মিলন এবং তার প্রতিবেশী নবীর শেখের মধ্যে একটি ছোটখাটো বিষয়ের ওপর তীব্র তর্ক হয়, যার ফলে দুই পরিবারের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। তর্কের সময় মিলন তার প্রতিবেশীর পক্ষে অবস্থান নেয় এবং এই বিষয়টি পরে ঘটনার সূত্রপাতের একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বুকের রাতের নামাজ শেষ করার পর মিলন তার বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় মসজিদে থেমে ছিলেন। ঠিক তখনই, বুড়ইল গ্রামে পাঁচ থেকে সাতটি মোটরসাইকেল নিয়ে ১০ থেকে ১৫ জন কিশোর-তরুণ মিলনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা হঠাৎই মিলনের দিকে ছুরি বের করে একাধিক আক্রমণ চালায়, ফলে শিকার একাধিক ছুরিকাঘাতের শিকার হন। আক্রমণকারী দল দ্রুতই সাইকেল চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়, আর মিলন আহত অবস্থায় রাস্তায় পতিত অবস্থায় পাওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুতই আহত শিকারের পাশে এসে তাকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসা দল শিকারের গুরুতর আঘাতের মূল্যায়ন করে, কিন্তু দ্রুতই জানায় যে শিকারের প্রাণ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। ডাক্তারের মতে, ছুরিকাঘাতের ফলে শিকারের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি হয়েছে এবং রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। শিকারের পরিবারকে মৃত্যুর খবর জানানো হয় এবং দুঃখ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহের দেহান্তিক প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
পুলিশ অফিসার মিজানুর রহমান ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেন এবং জানান, শিকারের মৃত্যুর সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান তদন্তের অধীনে সন্দেহভাজনদের সনাক্তকরণ, গোপনীয়তা রক্ষা এবং সাক্ষ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এছাড়া, পুলিশ অভিযানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কিশোর-তরুণদের গ্রেফতার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। অফিসার মিজানুর আরও জানান, শিকারের লাশের অটোপসি (মৃতদেহ পরীক্ষা) সম্পন্ন হওয়ার পর ফলাফল মর্গে সংরক্ষিত থাকবে এবং তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
অভিযানের সময়, স্থানীয় মসজিদ ও গ্রাম পরিষদকে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে এবং ঘটনাস্থলে নিরাপত্তা বজায় রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। গ্রামবাসীরা ঘটনায় শোক প্রকাশ করে এবং শিকারের পরিবারকে সমবেদনা জানায়। স্থানীয় প্রশাসনও শিকারের পরিবারকে সহায়তা প্রদান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হিংসাত্মক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে মৃত্যুর অপরাধটি ধারা ৩৪ (হত্যা) এবং ধারা ৩৩ (অসাবধানতায় মৃত্যুদণ্ড) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য। সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া চালু হবে এবং আদালতে প্রমাণ-প্রসঙ্গ উপস্থাপনের পর চূড়ান্ত রায় দেওয়া হবে। বর্তমানে, গ্রাম পুলিশ দপ্তর তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে আপডেট দিচ্ছে এবং কোনো অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ না করে গোপনীয়তা রক্ষা করছে।
শিকারের মৃত্যুর পর, নন্দীগ্রাম থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, তদন্ত চলাকালীন সময়ে স্থানীয় যুবক-যুবতীদের মধ্যে সংঘাতের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করা হবে এবং সম্প্রদায়ে শান্তি বজায় রাখতে সামাজিক কর্মসূচি চালু করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সকলকে সহযোগিতা করতে হবে এবং হিংসা কোনো সমস্যার সমাধান নয়।
এই দুঃখজনক ঘটনা স্থানীয় সমাজে শক সৃষ্টি করেছে এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বেড়ে চলা হিংসার প্রতি সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য হবে।



