যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মুখপাত্রের মাধ্যমে জানিয়েছে যে, জাতিসংঘের মোট প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের বকেয়ার মধ্যে মাত্র ১৬ কোটি ডলারই প্রদান করা হয়েছে। এই অর্থপ্রদানটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘের নিয়মিত পরিচালনা বাজেটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে এই ক্ষুদ্র পরিমাণের অর্থপ্রদান জাতিসংঘের আর্থিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলবে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এই পরিমাণের অর্থপ্রদান নিশ্চিত করে বলেন যে, এটি মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজেটের জন্য নির্ধারিত অর্থের একটি অংশ। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই অর্থপ্রদানটি এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া পরিমাণের তুলনায় অল্পই।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মোট বকেয়া প্রায় ২.১৯৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে চলতি বছরের জন্য ৭৬.৭ কোটি ডলার অন্তর্ভুক্ত। তাছাড়া, শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য অতিরিক্ত ১.৮ বিলিয়ন ডলার বকেয়া রয়েছে। এই সবের সমষ্টি জাতিসংঘের মোট বকেয়ার প্রায় ৯৫ শতাংশই মার্কিন সরকার থেকে পাওনা।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত মাসে সতর্ক করে জানান যে, সদস্য দেশগুলো যদি দ্রুত বকেয়া পরিশোধ না করে, তবে জুলাই মাসের মধ্যে জাতিসংঘের নিয়মিত কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে যেতে পারে। গুতেরেসের এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগের সঞ্চার করেছে।
ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর’ এবং ‘ফাঁপা কথার জায়গা’ হিসেবে সমালোচনা করে আসছেন। তার প্রশাসন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩১টি জাতিসংঘ কর্মসূচি থেকে বাদ দিয়েছে, যার মধ্যে গণতন্ত্র তহবিল এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত।
বৈঠকটি ওয়াশিংটনে নবগঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (Board of Peace) এর উদ্বোধনী সেশনের সময় অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ট্রাম্পের কণ্ঠে পূর্বের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা যায়। তিনি উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে আর্থিকভাবে সমর্থন করবে এবং নিশ্চিত করবে যে সংস্থা টিকে থাকবে।
তবে ট্রাম্প এই বকেয়া পরিমাণ কখন সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হবে তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি। তার এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, যদিও অর্থপ্রদান চালু রয়েছে, তবে বকেয়ার পরিমাণ হ্রাসের জন্য কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া পরিশোধে দেরি অব্যাহত থাকে, তবে জাতিসংঘের শান্তি রক্ষাকারী মিশন, মানবিক সহায়তা এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শান্তিরক্ষা মিশনের জন্য বকেয়া ১.৮ বিলিয়ন ডলার জাতিসংঘের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের আর্থিক সংকটের ফলে সদস্য দেশগুলোকে বকেয়া পরিশোধের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হতে পারে। গুতেরেসের পূর্ববর্তী সতর্কবার্তা অনুসারে, যদি জুলাইয়ের মধ্যে বকেয়া পরিষ্কার না হয়, তবে জাতিসংঘের নিয়মিত বাজেটের বেশিরভাগ কার্যক্রম স্থগিত হতে পারে, যা বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাধা সৃষ্টি করবে।
মার্কিন সরকারের এই ধীর গতি এবং ট্রাম্পের সমালোচনামূলক অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কিছু দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে বকেয়া দ্রুত পরিশোধের আহ্বান জানিয়ে থাকে, অন্যদিকে কিছু দেশ ট্রাম্পের জাতিসংঘের প্রতি সমর্থনমূলক মন্তব্যকে স্বাগত জানায়।
জাতিসংঘের আর্থিক অবস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বকেয়া পরিশোধের অগ্রগতি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নীতি ও সহযোগিতার দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্তমান পরিস্থিতি দেখায় যে, যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক দায়িত্ব পালন না করলে জাতিসংঘের কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে, যা বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়নকে প্রভাবিত করবে।



