স্বাধীনতার পর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধান রচনার কাজ শুরু করে, তবে সম্পূর্ণ খসড়া তৈরি করতে নয় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এই সময়ে চারজন গভর্নর জেনারেল, চারজন প্রধানমন্ত্রী এবং দুটি গণপরিষদ পরিবর্তিত হয়। সংবিধানিক কাজের প্রথম ধাপ হিসেবে ‘আদর্শ প্রস্তাব’ বা অবজেকটিভ রেজোল্যুশন উপস্থাপন করা হয়।
১৯ মার্চ ১৯৪৯-এ প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণপরিষদের সামনে এই প্রস্তাব পেশ করেন। পাঁচ দিন পরে, ১২ মার্চ, প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন লিয়াকত আলীর পরামর্শে ২৪ সদস্যের একটি মূলনীতি কমিটি (বিপিসি) গঠন করেন। এই কমিটিতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এর আহ্বায়ক ছিলেন লিয়াকত আলী খান, সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন গণপরিষদের স্পিকার তমিজউদ্দিন খান।
কমিটি প্রায় এক বছর ও ছয় মাস কাজ করার পর, ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৫০-এ লিয়াকত আলী খান আবার গণপরিষদের সামনে বিপিসির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে বলা হয় যে পাকিস্তান একটি ফেডারেল রূপ নেবে, শাসনব্যবস্থা হবে সংসদীয়, কেন্দ্রীয় আইনসভা দ্বিকক্ষীয় হবে এবং প্রতিটি প্রদেশের নিজস্ব আইনসভা থাকবে। রাষ্ট্রপ্রধানের পদে দু’কক্ষের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে নির্ধারিত করা হয়। পাশাপাশি, উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়।
এই প্রস্তাব পূর্ব পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যদিও পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা পশ্চিমের তুলনায় বেশি, তবে উভয় প্রদেশকে সমান সংখ্যক আসন দেওয়ার ফলে পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিত্ব কমে যায়। বিশেষ করে ভাষা সংক্রান্ত ধারাটি সবচেয়ে বেশি বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে; ৫৪ শতাংশ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা হলেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তকে পূর্ববঙ্গের জনগণ একটি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখেছে।
প্রস্তাবের আগে, নাজিমুদ্দিন যখন পূর্ববঙ্গ সফর করেন, তখন তিনি স্টুডেন্টস অ্যাকশন কমিটির সঙ্গে একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন, যেখানে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার অঙ্গীকার করা হয়। উর্দু একমাত্র ভাষা করার সিদ্ধান্তকে সেই অঙ্গীকারের সরাসরি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে, পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন শহরে, বিশেষত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকা সত্ত্বেও, ফজলুল হক ও অন্যান্য নেতারা আলোচনা সভা আয়োজন করে প্রতিবাদকে সংগঠিত করতে শুরু করেন।
বিপিসির প্রস্তাবের বিরোধী শক্তি দ্রুত সংহত হয় এবং পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক পরিবেশে ভাষা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এই আন্দোলন পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৬৬ সালের ছয় দফা দাবি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, যা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোকে প্রভাবিত করে। বর্তমান সময়ে এই ঐতিহাসিক ঘটনা বিশ্লেষণ করা হলে দেখা যায়, সংবিধানিক প্রস্তাবের ভাষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই ছিল পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয় পরিচয়ের সংগ্রামের সূচনা।
পাকিস্তানের সংবিধানিক প্রক্রিয়ার এই প্রাথমিক ধাপটি দেখায় যে, সংবিধান রচনার সময় জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি সংবেদনশীলতা না দেখালে কীভাবে জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়। ভবিষ্যতে যদি কোনো সংবিধানিক সংস্কার বা নতুন প্রস্তাবনা আসে, তবে পূর্ববঙ্গের মতামত ও জনমতকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি না হয় এবং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।



