অ্যান্টার্কটিকা উপদ্বীপে তাপমাত্রা বাড়ার প্রাথমিক সংকেতগুলোকে কেন্দ্র করে একটি নতুন গবেষণা ২০ ফেব্রুয়ারি “ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স” জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা বর্তমান পরিবর্তনগুলো নথিভুক্ত করে ২১০০ সালের সম্ভাব্য উষ্ণতা দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করেছেন, যা ভবিষ্যতে মহাদেশের পরিবেশগত অবস্থা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপদ্বীপটি ছোট হলেও মাছ ধরা, পর্যটন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার কারণে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে বিশেষভাবে প্রকাশ্য। এ কারণে এর পরিবর্তনগুলোকে অ্যান্টার্কটিকার সতর্কতা ঘণ্টা হিসেবে ধরা হয়, যা সমগ্র মহাদেশের পরিবেশগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিতে পারে।
অবধি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গ্লোবাল গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পিক স্তরের তুলনায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার পর থেকেই উপদ্বীপে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, উপদ্বীপের কাছাকাছি ঘূর্ণায়মান উষ্ণ সর্কাম্পোলার ডিপ ওয়াটার গলন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে, ফলে বরফের গলন হার বৃদ্ধি পেয়েছে।
গবেষণায় বর্তমান অবস্থা নথিভুক্ত করার পর তিনটি উষ্ণতা পরিস্থিতি—১.৮°C, ৩.৬°C এবং ৪.৪°C—প্রাক-শিল্পিক স্তরের তুলনায় মডেল করা হয়েছে। এই দৃশ্যপটগুলো গ্লোবাল গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রবণতা ভিত্তিক এবং ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা কতটা বাড়তে পারে তা অনুমান করে।
প্রতিটি দৃশ্যপটে উপদ্বীপের সামুদ্রিক ও স্থলীয় বাস্তুতন্ত্র, ভূমি ও সমুদ্রের বরফ, বরফ শেলফ এবং চরম আবহাওয়া ঘটনার উপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বরফের গলন দ্রুত হবে, যা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে ব্যাহত করবে।
বিশেষ করে, উপদ্বীপের দক্ষিণ অংশে গলনশীল গ্লেসিয়ারগুলো পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকার গ্লেসিয়ারগুলোর স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। গ্লেসিয়ার রিট্রিটের ফলে ভূ-তাপীয় চাপ বাড়ে, যা বৃহত্তর অঞ্চলের বরফ গলনকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
সমুদ্রের বরফের পরিমাণ হ্রাস পেলে দক্ষিণ মহাসাগরের তাপমাত্রা আরও বাড়ে, ফলে সমুদ্রের পানির ঘনত্ব ও প্রবাহের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন অ্যান্টার্কটিক ইন্টারমিডিয়েট ওয়াটার গঠনের হারকে কমিয়ে দেয়, যা বিশ্বব্যাপী মহাসাগরের সঞ্চালনে প্রভাব ফেলতে পারে।
বরফের হ্রাসের আরেকটি সরাসরি ফলাফল হল ক্রিলের সংখ্যা কমে যাওয়া। ক্রিল, যা দক্ষিণ মহাসাগরের খাদ্য শৃঙ্খলের ভিত্তি, তাদের প্রজনন ও বেঁচে থাকার জন্য বরফের উপস্থিতি অপরিহার্য। বরফ কমে গেলে ক্রিলের জনসংখ্যা হ্রাস পায়, ফলে বৃহত্তর সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য সরবরাহে প্রভাব পড়ে।
উপদ্বীপে ঘটমান পরিবর্তনগুলো শুধুমাত্র স্থানীয় নয়; সেগুলো সমগ্র অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ মহাসাগরের জলবায়ু প্যাটার্নকে প্রভাবিত করে। গ্লেসিয়ার রিট্রিট, বরফের হ্রাস এবং ক্রিলের পতন একত্রে সমুদ্রের তাপমাত্রা, প্রবাহ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রকে পরিবর্তন করতে পারে।
গবেষকরা জোর দিয়ে বলেন, বর্তমানের উষ্ণতা প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা হয়, তবে এই পরিবর্তনগুলো অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠতে পারে। তাই গ্লোবাল গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি, যাতে উপদ্বীপের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং কার্বন নির্গমন হ্রাসের নীতি বাস্তবায়নই এই ঝুঁকি কমানোর মূল চাবিকাঠি। সময় এখনই, কারণ আজকের সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকার অবস্থা নির্ধারণ করবে।
আপনারা কি মনে করেন, গ্লোবাল উষ্ণায়ন মোকাবিলায় আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরই হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার ভিত্তি।



