২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ ঢাকা শহরের চকবাজারের চুড়িহাট্টা এলাকায় এক বিশাল অগ্নিকাণ্ড ঘটায়, যার ফলে ৭১ জন প্রাণ হারায়। ঘটনাস্থলে জুম্মন ওয়াহেদ ভবনের নিচের ডেকোরেটর শপে কাজ করছিলেন এক শ্রমিকের বাবা, যিনি শিখা থেকে নিহত হন। তার পুত্র মো. আসিফ, পাঁচ ভাইয়ের বড় সন্তান, তখনই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন।
আসিফের বর্ণনা অনুসারে, তার দুই ভাই তখন পড়াশোনা করছিল, আর অগ্নিকাণ্ডের পর তাদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি পরিবারের প্রধান দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে কাপড়ের দোকানে কর্মরত। তিনি জানান, বাবার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার আর্থিক ও মানসিকভাবে বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে।
চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পরপরই মামলাটি দায়ের হয়, তবে সাত বছর পার হওয়া সত্ত্বেও আদালতে কোনো সাক্ষীর সরাসরি সাক্ষ্য নেওয়া হয়নি। গত ছয় মাসে একটিও সাক্ষী আদালতে হাজির হননি, ফলে বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
মামলার প্রধান বাদী মো. আসিফ এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আদালতে দ্রুত ন্যায়বিচার চায়। রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিত্বকারী পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে উল্লেখ করেন যে, সাক্ষীরা সমন পেয়ে আদালতে না আসায় বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পর, ২৮ মার্চ ২০১৯-এ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসএসসি) একটি গণশুনানি আয়োজন করে, যেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। তখনকার মেয়র সাইদ খোকন প্রতিশ্রুতি দেন যে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক ও কর্মসংস্থান সহায়তা প্রদান করা হবে।
প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে, ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ডিএসএসসি ২১টি পরিবারকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক মাস্টার রোলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ প্রদান করে। এছাড়া চারটি পরিবারকে দুই লাখ টাকার চেকের মাধ্যমে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় এবং আর চারটি পরিবারকে সিটি কর্পোরেশনের অধীনে অফিসার পদ প্রদান করা হয়। দু’টি পরিবারকে কর্পোরেশনের বাজারে দোকান বরাদ্দের জন্য কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়।
আসিফের মতে, যদিও মাস্টার রোলে চাকরি প্রদান করা হয়েছে, তবে অধিকাংশ পরিবার এখনও স্থায়ী কর্মসংস্থান পায়নি। অফিসার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত চারটি পরিবার এখনও পদে বসেনি, এবং দোকান বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি সম্পন্ন হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন যে, দুই পরিবারকে তিন লাখ টাকার চেক প্রদান করা হলেও, তা এখনও ব্যবহারযোগ্য হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো পুনরায় ডিএসএসসির কাছে সমাধানের দাবি তুলে ধরছে। তারা দাবি করে যে, প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে প্রদানকৃত আর্থিক ও কর্মসংস্থান সহায়তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হয়নি, ফলে তাদের জীবনের পুনর্গঠন এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
অধিকন্তু, আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের ধীরগতি নিয়ে পরিবারগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করে যে, সাক্ষীরা সমন পেয়ে আদালতে না আসা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ণ করছে। আদালতকে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হচ্ছে।
সামাজিক ও আইনি বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, এমন বড় আকারের দুর্যোগের পর দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে, মামলার দ্রুত সমাপ্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ সহায়তা প্রদান না হলে, ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নতুন নির্দেশনা প্রকাশিত হয়নি। তবে, পাবলিক প্রসিকিউটর ও সংশ্লিষ্ট আদালতকে অনুরোধ করা হয়েছে যে, সাক্ষী সমন পেয়ে দ্রুত আদালতে হাজির হওয়ার ব্যবস্থা করে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করা হোক, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ন্যায়সঙ্গত সমাধান প্রদান করা যায়।
এই ঘটনার সাত বছর পরও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যথাযথ আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা না পৌঁছানোর বাস্তবতা, দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষতিপূরণ নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ভবিষ্যতে অনুরূপ দুর্যোগে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রক্রিয়ার পুনর্বিবেচনা দাবি করা হচ্ছে।



